এক বছরের জন্য লিজ নিয়ে সরকারি ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেছিলেন। লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নবায়ন করেননি। নিয়মিত ভাড়াও দেননি। একপর্যায়ে সরকার সেই লিজ বাতিল করে দখল বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকারি ভবন ছেড়ে দেওয়ার বদলে শুরু হয় অন্য খেলা। প্রায় চার দশক আগের একটি কথিত দলিল হাজির করে দাবি করা হয় জমির মালিকানা। সেই দলিলের ভিত্তিতে নামজারি, এরপর সন্তানদের নামে হেবা। আর সেই সরকারি ভবনেই চলছে পরিবারের বিভিন্ন ব্যবসা।
চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ২৪ দশমিক ৯৬ শতকের সরকারি জমি ও ভবন দখলের এই ঘটনাকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। জাল দলিল ও নথি ব্যবহার করে। সরকারি সম্পত্তির মালিকানা নিজেদের নামে নেওয়া এবং দীর্ঘদিন দখলে রাখার অভিযোগের প্রমাণও মিলেছে দুদকের অনুসন্ধানে।
দুদকের হিসাবে, জমির মূল্য ও দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি ভাড়াসহ সম্পত্তিটির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা। এ ঘটনায় একই পরিবারের সাত সদস্য এবং গণপূর্তের তৎকালীন এক উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।
দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার লে-আউট প্ল্যানের ১৬ নম্বর প্লটটির মূল লিজগ্রহীতা ছিল ‘মেসার্স এস জে অ্যান্ড জি ফজলে এলাহী লিমিটেড’। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তিনি দেশত্যাগ করলে ১৯৭২ সালে সম্পত্তিটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরবর্তী সময়ে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় চলে যায়। এর দেখভাল করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে।
এরপর ২০০৩ সালে সম্পত্তিটি ‘মেসার্স কনকর্ড ট্রেডিং কোম্পানি’র পক্ষে মো. ফরিদ আহমেদ ও তার বোন হাসিনা মমতাজ লিজ নেন। বার্ষিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪২০ টাকা। চুক্তির মেয়াদ ছিল এক বছর এবং প্রতিবছর পারস্পরিক সম্মতিতে নবায়নের সুযোগ ছিল। দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৫ সালের পর লিজ আর নবায়ন করা হয়নি। ভাড়া দেওয়াও বন্ধ করে দেন তারা। দখল ছাড়েননি সংশ্লিষ্টরা।
ভাড়াটিয়া থেকে যেভাবে বনে যান মালিক!
দীর্ঘদিন কোনো চুক্তি ও ভাড়া না দেয়ায় ২০১১ সালের ১০ মে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় লিজ চুক্তি বাতিল করে এবং সম্পত্তিসহ ভবনটির শতভাগ দখল বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দেয় চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগকে। কিন্তু লিজ বাতিল হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় জালিয়াতির গল্প। হাতছাড়া হতে যাওয়া সরকারি সম্পত্তি ‘গিলে খেতে’ ভাড়াটিয়া চক্রটি হাজির করে ১৯৭০ সালের এক রহস্যময় দলিল।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, লিজ বাতিলের পরপরই ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি ফাতেমা বেগম হঠাৎ দাবি করেন-তিনি নাকি ১৯৭০ সালেই পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল মূলে এই জমির একক মালিক হয়েছিলেন! তবে দুদকের অনুসন্ধানে এ নিয়ে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি দপ্তরের সমস্ত রেকর্ডপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক পোড়া নথির সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত ফাতেমা বেগম চট্টগ্রাম সদরে দলিল সম্পাদন না দেখিয়ে পটিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের দোহাই দিয়ে বানিয়ে ফেলেন এক ভুয়া দলিল (নম্বর-৩২৮০, তারিখ: ১৯ মে ১৯৭০)।
দুদক জানায়, জালিয়াতি ঢাকতে গিয়ে অসাধু চক্রটি এমন কিছু ভুল করে বসে, যা যেকোনো গল্পের জালিয়াতিকেও হার মানায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৭০ সালের যে বিক্রি চুক্তির ফটোকপি জমা দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলপয়েন্ট কলমের স্বাক্ষর রয়েছে। অথচ সত্তরের দশকে বাংলাদেশে বলপয়েন্ট কলমের কোনো প্রচলনই ছিল না! এখানেই শেষ নয়, তারা দলিলে জমি বিক্রির চুক্তির তারিখ দেখায় ১৯৭০ সালের ৩ জুলাই, অথচ সাব-রেজিস্ট্রি দলিলের তারিখ দেখায় ১৯৭০ সালের ১৯ মে! অর্থাৎ চুক্তি সই হওয়ার দুই মাস আগেই অলৌকিকভাবে দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যায়! আর অনুসন্ধানের মুখে কথিত এই রহস্যময় দলিলের আসল বা সার্টিফাইড কপি কখনো উপস্থাপন করতেই পারেননি ফাতেমা বেগম।
সরকারি ফাইলেও জাল নথি, তারপর ভাগাভাগি :
এই অসম্ভব জালিয়াতিকে সরকারি নথিতে গ্রহণযোগ্যতা করতে ভূমিকা রাখেন তৎকালীন গণপূর্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (বর্তমানে বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক। ২০১২ সালে সরেজমিনে তদন্তের নামে এই ভুতুড়ে কাগজপত্র যাচাই না করেই সত্যায়িত করে নামজারির সুপারিশ করেন। তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দিলে আগ্রাবাদ ভূমি অফিস থেকে ফাতেমা বেগমের নামে নামজারি সম্পন্ন হয়।
নামজারি বাগিয়ে নেওয়ার পর শুরু হয় সরকারি সম্পত্তি মা ও ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা। ২০২০ সালে ফাতেমা বেগম এক হেবা দলিলের মাধ্যমে জমিটি সন্তানদের দান করে দেন। ভবনটির নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ফাতেমা হাইটস’। বর্তমানে এর ১ম তলায় কন্যা হাসিনা মমতাজ ‘সানওয়ে মেডিকেল সেন্টার’, ২য় তলায় পুত্র মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ ‘আগ্রাবাদ কনভেনশন হল’ এবং ৩য় তলায় অপর পুত্র মো. ফরিদ আহমেদ সিএন্ডএফ এজেন্টের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
দুদকের হিসাবমতে, বর্তমানে এই ২৪.৯৬ শতক জমির মৌজা মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ ৬৩,১৪০ টাকা এবং বিগত দুই দশকে আত্মসাৎ করা ভবনের সরকারি ভাড়া ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬,০৯৮ টাকা। সব মিলিয়ে আত্মসাতের অংক দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯,২৩৮ টাকা।
আটজনের বিরুদ্ধে হচ্ছে মামলা :
জাল রেকর্ডপত্র তৈরি ও তা ব্যবহার করে চট্টগ্রামে প্রায় ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। কমিশনের চট্টগ্রাম-১ কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন : চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক। সরকারি জমি দখলে অভিযুক্ত ফাতেমা বেগম, তার তিন ছেলে মো. ফরিদ আহমেদ, মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ ও মোহাম্মদ ফয়েজ আহমেদ, তিন মেয়ে হাসিনা মমতাজ, রোকেয়া সুলতানা ও শাহীন সুলতানা।