বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরী মৃত্যুর মামলার তদন্তে নেমে এক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। শুক্রবার রাতে বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া জুনিয়র বন্ধু দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এদিকে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ।
যে ফুটেজের সূত্রে জানা যায়, ঘটনার রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এক তরুণী এবং জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটান তাহসিফ। পরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায়। সেখান থেকে কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ ও তার বান্ধবী। তারা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। ওই তরুণীকে খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি করেছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’।
এর আগে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে। পরে শুক্রবার রাতে নৌপুলিশের কাছে তাকে হস্তান্তর করে পিবিআই। ওই রাতেই ডিএমপির উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম হেলাল। ওই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখিয়ে শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ। পরে নৌপুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। সুরতহাল করার সময় তাহসিফের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পোশাক পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা দৌড়ে দুইদিকে চলে যান। এরপর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে তার দাবি। তবে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা কারা, তারা কেন ধাওয়া করেছিলেন, তাহসিফ কী কারণে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল-এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নৌপুলিশের কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তবে তার বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, দীপ পুরো ঘটনার সঙ্গে ছিলেন। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য সামনে আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাহসিফ সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন, তা জানার চেষ্টা চলছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। সব তথ্য পর্যালোচনা করেই প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা চলছে।
বারে তরুণীর সঙ্গে তাহসিফ : মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তাহসিফ বাসা থেকে দীপের সঙ্গে বের হলেও ওই রাতে ১০টা ১৭ মিনিটে এক তরণীকে নিয়ে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে’ গিয়েছিলেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর। গোয়েন্দারা তার ছবি সংগ্রহ করেছেন। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে ওই বার ও রেস্টুরেন্টে যান তাহসিফ। তার সঙ্গে ছিলেন ওই তরুণী। পরে সেখান থেকে তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তবে সেখানে ওই তরুণী গিয়েছিলেন কি না, সেটা এখনো জানা যায়নি। পুলিশের ধারণা, ওই এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তরুণী গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরেছিলেন। বারে প্রবেশের সময় তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। এ সময় হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার আগের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
সত্য উদ্ঘাটন চায় রাওয়া : তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা রাওয়া। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা। এ সময় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পরে রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিমের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা। তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনার অনুসন্ধান করছে। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছে। খুরশিদ আলম আরও বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে তাহসিফের মৃত্যু অত্যন্ত কষ্টের। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তারা ছেড়ে দেবেন না। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার চান তারা।
অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে হত্যা মামলা: তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম শুক্রবার রাত ১টার দিকে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।