কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীতে সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কুতুপালংয়ে বনবিভাগের জমি ও সরকারি খাসজমিতে একের পর এক নতুন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও উচ্ছেদের তৎপরতা, কোথাও আবার দখলের বিস্তার। প্রশাসনের এই ভিন্নমুখী ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুতুপালং বাজার ও আশপাশের এলাকায় সরকারি জমি এবং বনবিভাগের জায়গা দখল করে নিয়মিত নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন দোকানপাট ও স্থাপনা। এসব স্থাপনা নির্মাণের পেছনে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি তাঁদের। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি জমিতে দোকান তৈরি করে তা বরাদ্দ দেওয়ার নামে দোকানপ্রতি ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সালামি কিংবা সিকিউরিটি মানি আদায় করা হচ্ছে। পরে এসব দোকান মাসিক ভাড়ায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব বরাদ্দের বৈধতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
বাজারের একাধিক সূত্রের দাবি, মাসের পর মাস ধরে নতুন দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দের এই কার্যক্রম চললেও তা বন্ধে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ফলে সরকারি জমিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লাভজনক দখলবাণিজ্য। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জমির প্রকৃত মালিকানা ও বরাদ্দের বৈধতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, কুতুপালং বাজারের যানজট যেন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সড়কের পাশে অবৈধ দখল, দোকানপাট সম্প্রসারণ এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণের কারণে সংকুচিত হচ্ছে চলাচলের জায়গা। এতে শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ পথচারীদের প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারের যানজট নিরসন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার অগ্রাধিকার নিয়ে। পালংখালীতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কুতুপালংয়ে সরকারি জমি দখল করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ কেন বন্ধ হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারি কোথায়? প্রভাবশালী কোনো মহলের কারণে কি উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এরই মধ্যে কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এক সদস্যের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে ওই ব্যক্তির দাবি, কক্সবাজার জেলার সব সাংবাদিক তাঁর নিয়ন্ত্রণে এবং তিনি তাঁদের নিয়মিত মাসিক মাসোহারা দেন। তাঁর ভাষ্য, কুতুপালং কিংবা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে কেউ সংবাদ প্রকাশ করবে না। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।
অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু সরকারি জমি দখলের বিষয় নয়, বরং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে ওই ব্যক্তির বক্তব্যের সত্যতা, সাংবাদিকদের অর্থ দেওয়ার দাবি এবং কথিত মাসোহারা লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও প্রশাসনের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতন মহলের দাবি, কুতুপালং বাজার ও আশপাশের বনবিভাগের জমি এবং সরকারি খাসজমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে অবৈধ স্থাপনার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। দোকান বরাদ্দের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, কথিত সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি কুতুপালং বাজারে যানজট নিরসনে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারি জমি কি সত্যিই জনগণের সম্পদ, নাকি প্রভাবশালী মহলের কাছে তা ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে? পালংখালীতে উচ্ছেদ আর কুতুপালংয়ে দখলের অভিযোগের এই বৈপরীত্যের অবসান চান স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। সূত্র: কক্সবাজার জার্নাল