পুকুরঘাটে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন মো. রাশিদুল হাসান। চারপাশে সবুজের সমারোহ। পুকুরের পানিতে হালকা ঢেউ। দূরে কয়েকজন গল্প করছেন। কেউ চুপচাপ বসে আছেন, কেউবা আপনমনে হাঁটছেন। এমন শান্ত, খোলামেলা পরিবেশের মধ্যেই হঠাৎ গান ধরলেন ৮৬ বছরের রাশিদুল হাসান। বয়সের ভার কণ্ঠে স্পষ্ট, তবে গানের আবেগে তার ছাপ নেই।
গান শেষ করে হাসলেন তিনি। তারপর কথা বললেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। কণ্ঠে ছিল অভিমান, তবে অভিযোগের তীব্রতা ছিল না। দীর্ঘ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এখন যেন অনেক কিছুই মেনে নিয়েছেন তিনি।
রাশিদুল হাসানের বর্তমান ঠিকানা রাউজানের নোয়াপাড়ার আমেনা-বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। এখানে এসেছেন প্রায় দুই মাস আগে। কেন এসেছেন জানতে চাইলে কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘ছেলের বিয়ে নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি এবং বনিবনা না হওয়ার কারণেই বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসি। ছেলে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল।’
তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছেলে বিসিএস ক্যাডার। পিএইচডি ডিগ্রিধারী। সরকারি চাকরির সুবাদে বিদেশে গেছেন। কিছুদিন পুলিশের চাকরিতেও ছিলেন এবং এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে দেশে না ফিরে পরিবার নিয়ে বিদেশেই বসবাস করছেন। তাঁর মেয়ে আমেরিকায় থাকেন। সন্তানেরা প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের বাবা এখন বৃদ্ধাশ্রমের নিবাসী।
রাশিদুল হাসানের জন্ম ১৯৪১ সালে কলকাতায়। পৈতৃক সূত্রে পরে এ অঞ্চলে চলে আসেন তিনি, মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। চাকরি করেছেন ‘খবরিকা’ পত্রিকায়। তাঁর বাবা মরহুম মুসা মিয়া ছিলেন চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর একান্ত সচিব এবং ‘ডেইলি স্টার অব ইন্ডিয়া’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১০৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিজের জীবনের একটি সময় রাশিদুল হাসান কাটিয়েছেন শহরের আসকারদিঘির পাড়ের নিজস্ব বাসায়। গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ের মিঠানালায়। বৃদ্ধাশ্রমে আসার আগে মিরসরাইয়ের একটি স্থানীয় পত্রিকা অফিসে থাকতেন এবং সেখানে কাজও করতেন। তাঁর স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি ঢাকায় তাঁর ভাইয়ের বাসায় থাকেন।
এত দীর্ঘ জীবন, এত পরিচয়, শিক্ষা ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এখন রাশিদুল হাসানের দিন কাটছে বৃদ্ধাশ্রমে। কেমন কাটছে তাঁর দিন জানতে চাইলে বললেন, ‘আশ্রিত জীবন মোটামুটি ভালোই কাটছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালো। পুকুরঘাটে বসে পেপার পড়ি। খাবার-দাবার শেষে বসে কখনো গল্প করি, গান করি। প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ উপভোগ করেই দিন চলে যাচ্ছে।’
বাড়িতে ফিরতে চান কি না এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর আরও স্পষ্ট। ‘বয়স তো আর কম হলো না। বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর ইচ্ছে নেই। কেউ খোঁজও রাখে না। এখানেই থেকে জীবনের ইতি টানতে চাই।’ বৃদ্ধাশ্রমের জীবনকে এখন আর তিনি শুধু আশ্রিত জীবন হিসেবে দেখছেন না। এখানকার মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে এক ধরনের আপনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখানে সবাই আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে। পরিবেশ সুন্দর, নিজের পরিবেশের মতো লাগে। খোলামেলা পরিবেশ।’
তিনি গান গেয়ে শোনালেন সবাইকে। বয়সের ভার কণ্ঠে থাকলেও গানের মধ্যে যেন অন্য এক রাশিদুল হাসানকে পাওয়া গেল। মনে হলো- গান তাঁর কাছে শুধু বিনোদন নয়, দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি থেকে কিছুটা সময় বেরিয়ে আসার একটি পথ। হয়তো গানের ভেতর দিয়ে ফিরে আসছিল কলকাতার শৈশব, বাবার স্মৃতি, কর্মজীবনের দিন, পরিবার, সন্তানদের ছোটবেলার কথা। গান থামার পর আবার তিনি ফিরে এলেন বর্তমানের বাস্তবতায় নোয়াপাড়ার এই বৃদ্ধাশ্রমে।
তবে রাশিদুল হাসানের কাছে প্রতিটি দিনই যেন একেকটি দীর্ঘ গল্প। একসময় কলকাতায় জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি বড় হয়েছেন। পিএইচডি করেছেন। নিজে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। পত্রিকায় চাকরি করেছেন। প্রতিষ্ঠিত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। নিজের ঘর ছিল, সংসার ছিল, সন্তান ছিল। তাঁর ছেলে বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, পুলিশের চাকরিতে এএসপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে বিদেশে গেছেন। মেয়ে আমেরিকায় বসবাস করছেন। কিন্তু ৮৬ বছর বয়সে এসে রাশিদুল হাসানের ঠিকানা এখন আমেনা-বশর। সূত্র: পূর্বকোণ