কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৌশল পাল্টিয়ে রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছেন। স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি এবং অসাধু চক্রের সহায়তায় রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন বলে লোকজন সূত্রে জানা গেছে। রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছেন; প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জনপ্রতিনিধি এবং অসাধু চক্রের হাতে স্থানীয়রা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এত এত কঠোরতার মাঝেও রোহিঙ্গারা কেমনে ভোটার হচ্ছেন, তা দেশপ্রেমিক নাগরিকদের ভাবিয়ে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের মাঝে ভোটার হওয়ার তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন উঠে যাওয়ার পর থেকে অসাধু চক্র রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন। সহায়তাকারী চক্রটি রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় ভোটার হওয়ার যোগ্য রোহিঙ্গা ছেলে-মেয়েরা ভুয়া ঠিকানা দেখিয়ে অহরহ ভোটার হয়েছেন। স্থানীয়দের বাপ-মা সাজিয়ে রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছেন। এবার বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার তৎপরতা দেখা গেছে।
উখিয়ার রাজাপালং ও টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগে ফাঁকিতে অহরহ রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ টেকনাফ-উখিয়ার বাইরে গিয়েও ভুয়া পিতা-মাতা দেখিয়ে ভোটার হয়ে আইডি কার্ড সংগ্রহ করেছেন। পরে ওই আইডি ব্যবহার করে এখানকার অসাধু জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে ছেলে-মেয়েদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অসাধুরা বয়স কমিয়ে বৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে সহযোগিতা দিচ্ছেন, এমন অভিযোগও জানা গেছে।
শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়া এলাকার বয়োবৃদ্ধ আমান উল্লাহ। বয়স অন্তত ৭০-৮০ বছরের কাছাকাছি। তিনি এই বয়সে ভোটার হচ্ছেন। যতদূর জানা গেল, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং সাবরাং ইউপি থেকে তিনি ওয়ারিশ সনদ বানিয়েছেন। ওই সনদে বৃদ্ধ আমান উল্লাহকে মৃত সোনা আলী ও মৃত ফরিদা খাতুনের সন্তান উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়ারিশ সনদে উল্লেখিত দুই স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে কেবল বৃদ্ধ আমান উল্লাহ বেঁচে আছেন। বাকি সকলে মারা গেছেন। তার মানে আমান উল্লাহর ভাই-বোনদের কেউ বেঁচে নেই। তিনি কিন্তু ভোটার হতে চাচ্ছেন হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম লেদা গ্রাম থেকে। এ কারণেই ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং হ্নীলা ইউপি থেকে নাগরিক ও মৃত্যু সনদ, ভোটার তথ্য যাচাই-বাছাই প্রত্যয়ন, চাচা এবং ফুফুর এনআইডি নেই মর্মে কাগজাদি নিয়েছেন। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল হ্নীলা ইউপি থেকে আমান উল্লাহর নামে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়। এদিকে সাবরাং ইউপি থেকে সংগৃহীত ওয়ারিশ সনদে তাঁর কোনো ভাই ও বোন জীবিত নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এর মাঝেও হ্নীলা ইউপি ওই আমান উল্লাহকে চাচা এবং ফুফুর এনআইডি নেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র কেমনে প্রদান করল? স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভোটার প্রত্যাশী বৃদ্ধ আমান উল্লাহ সত্যি সত্যি শাহপরীর দ্বীপের হলে তিনি ওই ইউনিয়ন থেকে নাগরিক ও জন্ম সনদ না নিয়ে হ্নীলা ইউপি থেকে কীভাবে এসব কিছু সংগ্রহ করলেন? যার নামে হ্নীলায় হোল্ডিং পর্যন্ত নেই। কোন যুক্তিতে ইউপি সংশ্লিষ্টরা তাঁকে বাংলাদেশি নাগরিক বানাতে সহায়তা করেছেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে বয়োবৃদ্ধ আমান উল্লাহ এবং তাঁর মেয়ে নাহিদা সোলতানা নিহা লেদা পশ্চিমপাড়া এলাকায় ভোটার হতে নিবন্ধন ফরম পূরণ করে জমা দিয়েছেন। তাঁরা এখন ছবি তোলার অপেক্ষায় আছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন। দেখা গেছে, বৃদ্ধ আমান উল্লাহর নিবন্ধন ফরম নং এনআইডিএফএন: ১২১৮০২০৬৭, মেয়ে নাহিদা সোলতানা নিহার নিবন্ধন ফরম নং এনআইডিএফএন: ১২১৮০০৮৪৯।
অপর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হ্নীলার বার্মাইয়া মৌলভী শমসুল আলম একজন প্রকৃত রোহিঙ্গা নাগরিক। তাঁকে সকলে বার্মাইয়া মৌলভী শমসু হিসেবে চেনে ও জানে। দুঃখজনক হলেও তিনি ভোটার হয়েছেন কক্সবাজারের বাইরের এলাকা থেকে। প্রকৃত রোহিঙ্গা হয়েও তিনি কীভাবে আইডি কার্ড পেলেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে বার্মাইয়া মৌলভী শামসুর ছেলে সাআদ ও মেয়ে ফাহিমা হ্নীলার পশ্চিম পানখালী থেকে নিবন্ধন করে ছবিও তুলেছেন। সাআদের এনআইডিএফএন: ১২১৪২৫৩২০। ফাহিমা আক্তারের এনআইডিএফএন: ১২১৪২৫০৯৪। প্রশ্ন উঠছে, বার্মাইয়া শমসুর ছেলে এবং মেয়ে কীভাবে ভোটার হলেন? কারা তাঁদের ভোটার হতে সহায়তা করেছেন? গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তা বের করা দরকার বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এভাবেই সাআদ, ফাহিমা, বৃদ্ধ আমান উল্লাহ, সমিরা ও নিহাদের মতো অহরহ রোহিঙ্গা ফাঁকিতে ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছেন এবং পড়ছেন, যা দেশমাতৃকার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বৃদ্ধ বাবা, তিনি তো রোহিঙ্গা। তাঁকে ভোটার করাচ্ছেন কেন? বাপের আইডি কার্ড ছাড়া নিজে ভোটার হলেন কেমনে? এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সমিরা বলেন, “ভাই, আপনারা আমাদের বিষয়গুলো শুধু শুধু জটিল করেন।” অপরদিকে সাআদ এবং ফাহিমাকে প্রশ্ন করা হলে তাঁরা তাঁদের অভিভাবকের সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
এদিকে লেদা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গা আমান উল্লাহ আইডি কার্ড করার জন্য তদবির চালাচ্ছেন। আওয়ামী আমলে বাপের ভুয়া আইডি কার্ড দেখিয়ে মেয়ে সমিরা এবং ছেলে রিদুয়ান ভোটার হয়েছেন। জুলাই-পরবর্তী সময়ে সমিরা বৃদ্ধ বাবাকে ভোটার করতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। এ কথা জানিয়ে বিএনপি নেতা হেলাল উদ্দিন রোহিঙ্গা কন্যা সমিরা আক্তার (এনআইডি নং-৩৭৫৫৯১৭৬৯১), বোন জমিলা আক্তার (এনআইডি নং-৬৯১৩২৭৭৯৯৯) এবং ভাই ছাত্রলীগ নেতা রিদুওয়ানের (ভোটার নং-২২১৮৯৪০০০৪৪৬) আইডি কার্ড বাতিলের পাশাপাশি রোহিঙ্গা বাবা এবং বোনকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করতে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই এলাকার কামরুল ইসলাম, আলী আকবর ও আব্দুল আমিনসহ অনেকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেদার বার্মাইয়া আমান উল্লাহর পরিবার আগে থেকেই মিয়ানমারের নাগরিক। তাঁদের ভোটার হওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। চিহ্নিত এসব বার্মাইয়া ভোটার হলে দেশের জন্য হুমকির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় মেম্বার নুরুল হুদা আমান উল্লাহকে শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা বলে দাবি করেন। তবে তাঁদের পূর্বপুরুষ মিয়ানমারের নাগরিক, তা-ও স্বীকার করেছেন। হ্নীলা ইউনিয়ন দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও লেদা ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবসার কামাল ছিদ্দিকী জানান, আমান উল্লাহ একজন প্রকৃত রোহিঙ্গা। তিনি কীভাবে ভোটার হচ্ছেন, তা বুঝে আসছে না। তাঁর মেয়ে সমিরা, বোন জমিলা ও ভাই রিদুওয়ান গত আওয়ামী আমলে পিতার ভুয়া আইডি দেখিয়ে ভোটার হয়েছেন, তা-ও অবৈধ। ২০২৫ সালে এসে রোহিঙ্গা বাবাকে ভোটার করতে তিনি দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আমরা বেঁচে থাকতে জেনেশুনে রোহিঙ্গা পরিবারকে ভোটার হতে দিতে পারি না।
হ্নীলা ৪নং ওয়ার্ড থেকে বারবার নির্বাচিত ইউপি সদস্য হোসাইন আহমদ জানান, তাঁর ওয়ার্ড থেকে কোনো বার্মাইয়া লোক ভোটার হতে পারেননি। সাআদ এবং ফাহিমা শত চেষ্টা করেও পারেননি। তাঁদের পিতা বাংলাদেশি না হওয়ায় তাঁদের ভোটার হতে সহযোগিতা দেননি বলে তিনি জানিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর ওয়ার্ড থেকে অতীতে কেউ ভোটার হয়ে থাকলে তাঁদেরও ভোটার তালিকা থেকে বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সালাহ উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কৌশলে কেউ হয়ে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে বাতিল করা হবে। বিশেষ কমিটির বৈঠকে তিনি উপরোক্ত বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এনআইডি কার্ড-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি এস.এম. অনীক চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে সহায়তা করা দেশদ্রোহিতার শামিল। এমন অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।” তথ্য গোপন করে কেউ ভোটার হয়ে থাকলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে জানিয়ে ইউএনও আরও বলেন, “তথ্য গোপন করে কেউ ভোটার হয়ে থাকলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে।” সূত্র: উখিয়া নিউজ