সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পর। অফিসে ব্যস্ততা চলছে। এমন সময় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নীলুফা ইয়াসমিনের অফিসে এক স্টাফ নিয়ে এলেন খালি পায়ে, সবুজ জামা পরা আট বছরের এক মেয়ে। জানালেন, বাস টার্মিনাল থেকে মেয়েটিকে পেয়েছেন। নাম মরিয়ম, চোখে ভালো দেখে না, মাদ্রাসায় পড়ে। এক ব্যক্তি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে টার্মিনালে ফেলে যায়।
কথা বলে ইউএনও জানতে পারেন—মরিয়মের বাবা মারা গেছেন, মা অন্ধ, বড় ভাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বোন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে ও সংসার সামলায়। সরকারি সহায়তায় ঘর ও অন্ধভাতা পান মা। এসব শুনে ইউএনও বুঝতে পারেন, মেয়েটি ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী এলাকার। সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রতিবন্ধীদের সরকারি তালিকা ঘেঁটে অল্প সময়েই পাওয়া যায় মরিয়মের মায়ের ঠিকানা।
রাত নেমে এসেছে। ইউএনও নিজেই ফোনে কথা বলেন অন্ধ মায়ের সঙ্গে। কণ্ঠে কেঁপে ওঠা আবেগ, মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় মায়ের চোখে জল। গ্রাম পুলিশ ও প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন তিনি মেয়েকে নিতে।
অপেক্ষার সময় ইউএনও জানতে পারেন, মরিয়মের চোখে চিকিৎসা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. বিমল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মরিয়মকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে; চিকিৎসক বিনা ফিতে পরীক্ষা করে চশমা দেন। চশমা পরে মরিয়ম বলে, “এখন আগের চেয়ে কিছুটা ভালো দেখি।”
এরপর ইউএনও ভাবলেন, খালি পায়ে মেয়েটিকে ফেরানো যায় না। কেনা হলো এক জোড়া সবুজ জুতো। জানতে চাওয়া হলো, তার প্রিয় রং কী? সে বলে, “হলুদ।” কিছুক্ষণ পর বলে ওঠে, “আমি লাল পরী হতে চাই—লাল জামা, লাল চুড়ি, লাল লিপস্টিক, আর মাদ্রাসায় পড়ি তাই লাল ওড়নাও লাগবে!”
ইউএনও নিজেই নিয়ে গেলেন তাকে কক্সবাজারের মেগামার্টে। দোকানে ঢুকে পুতুল দেখে জিজ্ঞেস করে, “এরা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে কেমন করে?” তার পছন্দে কেনা হলো লাল ফ্রক, লাল চুড়ি, লাল ওড়না ও লিপস্টিক। মুহূর্তেই সে হয়ে উঠল ‘লাল পরী’।
এ সময় অফিসে পৌঁছে গেল মরিয়মের মা, বোন ও গ্রাম পুলিশ। মেয়েকে দেখে অন্ধ মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি, চোখে আনন্দাশ্রু। মরিয়ম মাকে জানায়, “আমি লাল পরী হয়েছি, দেখো!” মা বিড়বিড় করে বলেন, “আল্লাহ, তুই আমারে ফেরত দিছস।”
অফিসে উপস্থিত সবার চোখে জল। নিচে নামার সময় মরিয়ম বলল, “এই গাড়িটার রংও তো আমার জামার মতো লাল। একটা ছবি তুলো না।” রাত ১০টার কিছু পর, ছোট্ট ‘লাল পরী’ মরিয়ম ফিরে গেল অন্ধ মায়ের কোলে—অন্ধকারের ভেতর এক টুকরো আলো হয়ে।