বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, আসন্ন ঢাকা বারের (ঢাকা আইনজীবী সমিতি) পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না জামায়াতে ইসলামি সমর্থিত সবুজ প্যানেল।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকা বার ভবনে সামনে আসন্ন আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে ষড়যন্ত্র, অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্ব মূলক ভূমিকা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন দখলের অভিযোগ করে তিনি বলেন, সারা দুনিয়াতে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আইনজীবীরা সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করে। এখানে আমরা দেখছি আইনজীবী একটি প্যানেল যেন কেন ভাবে নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন কে নিজেদের মতো করে সাজানো হয়েছে। ১১ জন সদস্য থাকবে নির্বাচন কমিশনে। তারমধ্যে একজন ছাড়া বাকি যে ১০ জন সদস্য থাকবেন, বারের কালচার অনুযায়ী সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাঁচজন এবং পাঁচজন করে দুইটা প্যানেল থেকে হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখানে দেখছি একটি প্যানেল থেকে ইতোমধ্যে ৭ জনকে চূড়ান্ত আকারে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা তার প্রতিবাদ করেছি। লিখিত আকারে প্রতিবাদ করেছি। আমরা অল্টারনেটিভ নাম ও জমা দিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, এখানে সাংবাদিক বন্ধুদেরকে উপস্থিত রেখে বলতে চাই, এইভাবে যদি ঢাকা বারের নির্বাচনকে চুরি করতে হয়। তাহলে আপনাদের এই বারে মুখ দেখানোর আর কোনো পরিবেশ থাকবে না। এবারের যারা বিচারক আছেন, সিনিয়র আইনজীবী আছেন, তাদের সাক্ষী রেখে বলতে চাই, যদি বারের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে হয়। এর চাইতে শরমের সারা দুনিয়াতে আর কিছু থাকার কথা নয়। আমরা আপনাদেরকে বলছি স্বচ্ছ নির্বাচন হবে। আপনাদের পক্ষ থেকে পাঁচজন হবে আমাদের পক্ষ থেকে পাঁচজন হবে। বাকি যারা আছে এই ১০০ জনের ভেতর থেকে ৫০ জন আমাদের দেবেন আপনাদের পক্ষ থেকে ৫০ জন দেবেন। এই ১শ ১১ জনের ভিতরে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকবে। এর বাইরে আছে ১১০ জন সেখান ৫৫ জন আমাদের দিতে হবে আর ৫৫ জন আপনারা নিবেন। এই বিবেচনায় নির্বাচনে যদি আমরা পরাজিত হই। পরাজয় মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু ইলেকশনকে ইঞ্জিনিয়ারিং করবেন আগে থেকে নির্বাচন কমিশনকে সাজাতে চাইবেন। আগে থেকে ভোট এবং ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর দিয়ে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে পার্টি অফিসে গণনা করবেন। ঢাকা বাড়ি সদস্যরা এরকম নির্বাচন হতে দিবে না।
তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, এই বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর জন্য ৫ আগস্ট দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ জীবন দিয়েছে। ত্রিশ হাজারও অধিক মানুষ তাদের নাক, কান, গলা, চোখ ও হাত-পা দিয়েছে। এরপরও যদি আপনাদের শিক্ষা না হয়। তাহলে এই বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টের মতো আপনাদেরও কবর রচিত হবে। আমি পার্লামেন্টের ভেতরে বাইরে সব জায়গায় সরকারের মধ্যে একটা ডিক্টেটোরিয়াল এক নায়ক তান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দেখা যাচ্ছে। আমরা আইনজীবী, আমরা ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিপক্ষে। কিন্তু যদি আপনারা ঢাকা বারের এই নির্বাচনকে ভয় পান।
অপর একটি প্যানেলকে সমর্থনকারী দলকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আশ্চর্যের বিষয় ঢাকা বারের এই নির্বাচনকে আপনারা এত ভয় পান কেন? ঢাকা বারের সদস্যরা যাকেই মনে চায় তাকেই নির্বাচিত করবেন। আপনারা আগেই নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চান কেন? সবচেয়ে লজ্জার ও অপমান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন দখল করতে চান। আমরা সবুজ প্যানেলের পক্ষ থেকে বলছি, যদি নির্বাচন কমিশন দখল করেন। এইভাবে নির্বাচন করতে চান। জনগণকে যদি আপনারা বিশ্বাস না করেন, বারের সদস্যদের বিশ্বাস না করেন। তাহলে আপনাদের অনিবার্যভাবে ফ্যাসিস্টদের মতো ভাগ্যবরণ করতে হবে। আমরা সকল সদস্যদের কে সাথে নিয়ে বলতে চাই আমরা স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে। আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে নির্বাচনের পক্ষে আমরা ইনক্লুসিভ নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু আপনারা ঘরের ভিতর বসিয়ে নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে সাজাচ্ছেন। মূলত আপনারা ঢাকা বারে নির্বাচন হতে দিতে চান না।
শিশির মনির অভিযোগ করে বলেন, উপরে বক্তৃতায় বলেন এক কথা আর ভিতরে কানে কানে করেন আরেক কাজ। যদি সাহস থাকে তাহলে এই ১শ দশ জনের ভিতরে ৫৫ জন আপনারা নেন, ৫৫ জন আমাদের দেন, প্রকাশ্যে নির্বাচন হোক। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভোট গণনা করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে অতীতে ভোট না করে ব্যালট বাক্স নিয়ে অফিসে চলে গেছে। আমরা আপনাদেরকে বলতে চাই সুস্পষ্ট দাবি আমাদের অবশ্যই ঢাকা বারে ভোট ডিজিটাল পদ্ধতিতে গণনা করতে হবে। কমিশনারদের নিয়ে বিশ্বাস করতে পারেন না। আপনাদের হাতে গণনার পদ্ধতিও আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। আসেন বসেন আমাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। বসবে ৫/১০ জন দেবেন ১শ জনের ভিতর পঞ্চাশ পঞ্চাশ নেবেন। আগামী ২৯ ও ৩০ তারিখ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। যদি তা মানতে না পারেন তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো যা ইচ্ছা তাই করতে চান। তাহলে ঢাকা বারের আইনজীবীরা সম্মিলিতভাবে এই ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে। আগামীতে আমরা ইনশাআল্লাহ স্বচ্ছ নির্বাচন করতে চাই। কোনো পাতানো নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করতে চাই না। আমাদের কথা স্পষ্ট। আগে থেকে কারিশমা করবেন। আগে থেকে নির্বাচন কমিশন ঠিক করবেন। এই রকম পাতানো খেলায় আমরা অংশগ্রহণ করতে রাজি নই। আমরা স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সম্পন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। আশা করি ঢাকা বারের সম্মিলিত সকল সদস্যগণ একসাথে হয়ে, ঢাকা বারের স্বচ্ছ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। ইনশাআল্লাহ সেই নির্বাচনে সবুজ প্যানেল অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নির্বাচনের জয়লাভ করবে।
উল্লেখ, ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনের আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গত ২৯ মার্চ রবিবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এবার ঢাকা বারে ৩০ হাজার আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি, সম্পাদকসহ ২৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশন মনোনীত হয়েছেন সমিতির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ মেয়াদে সর্বশেষ ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২১টি পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিতরা আদালতে আসা বন্ধ করে দেন। এতে সমিতির সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই পরিস্থিতিতে ওই বছরের ১৩ আগস্ট অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা। বর্তমানে এই কমিটি দায়িত্ব পালন করছেন।