কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার অদূরে ইনানী সৈকতের নীল জলরাশি আর পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অভিজাত সী পার্ল বিচ রিসোর্ট এন্ড স্পা।
ঝলমলে আলোকসজ্জা, বিদেশি ধাঁচের স্থাপনা, শত শত পর্যটকের আনাগোনা—সব মিলিয়ে যেন এক সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিলাসী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-কে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় এই রিসোর্টে ৩২৫ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে বাধ্য করা হয়। সময়ের ব্যবধানে সেই অর্থ সুদে-আসলে এখন প্রায় ৬০০ কোটিতে পৌঁছেছে। অথচ বছরের পর বছর পার হলেও সেই টাকা ফেরত পায়নি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘটনায় বারবার উঠে এসেছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম।
সীপার্ল বিচ রিসোর্ট এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমিনুল হক শামীম ও ডিরেক্টর ময়মনসিংহের সাবেক মেয়র ইকরামুল হক টিটুর বিরুদ্ধে অভিযোগ—রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে আইসিবির ওপর চাপ সৃষ্টি করে তারা এই বিনিয়োগ অনুমোদন করিয়েছিলেন।
২০১৭ সালে সি পার্ল কর্তৃপক্ষ আইসিবির কাছ থেকে ৩২৫ কোটি টাকার বন্ড সুবিধা নেয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১০ শতাংশ সুদে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে ষান্মাসিক কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের কথা ছিল। কাগজে-কলমে পরিকল্পনাটি আকর্ষণীয় দেখালেও বাস্তবে শুরু থেকেই এতে ছিল নানা অসঙ্গতি।
আইসিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই প্রকল্পটির আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আপত্তি ছিল। কিন্তু সেই আপত্তি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গুরুত্ব পায়নি। বরং দ্রুততার সঙ্গে বিনিয়োগ অনুমোদনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি ছিল সাধারণ কোনো করপোরেট বিনিয়োগ নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। অনেকেই আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই সেই চাপ মোকাবিলা করতে পারেননি।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্ড চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল নির্দিষ্ট সময় পর বন্ডের ২০ শতাংশ শেয়ারে রূপান্তর করা। কিন্তু সেই শর্ত বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু তাই নয়, বিনিয়োগের বিপরীতে সম্পদের ওপর প্রথম চার্জ বা বন্ধকীকরণও সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় এই বিপুল বিনিয়োগ কার্যত কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই ঝুলে আছে।
আইসিবির নথিপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় মূল অর্থের সঙ্গে সুদ যোগ হয়ে পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৬ টাকা।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এখন কার্যত আটকে আছে একটি বেসরকারি রিসোর্ট ব্যবসার কাছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—সি পার্লের ব্যবসা বন্ধ নয়। বরং পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন শত শত পর্যটক সেখানে অবস্থান করেন।
আন্তর্জাতিক মানের কক্ষ, কনভেনশন সুবিধা, ওয়াটার পার্ক, রেস্টুরেন্ট ও ইভেন্ট ব্যবসা থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—যে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ব্যবসা করছে, তারা কেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরত দিচ্ছে না?
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবির কাজ দেশের পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ খাতকে শক্তিশালী করা। কিন্তু একটি বেসরকারি রিসোর্ট প্রকল্পে এত বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে ভেতর-বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এমন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী জামানত, প্রকল্পের বাস্তবসম্মত নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সি পার্লের ক্ষেত্রে এসব শর্ত শিথিল করা হয়েছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বছরের পর বছর কিস্তি বকেয়া থাকলেও আইসিবি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাগাদা চিঠি দিয়েই দায় শেষ করেছে।
আইসিবির ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে পর্যন্ত এই ফাইল “স্পর্শকাতর” হিসেবে বিবেচিত ছিল। ফলে অনেক কর্মকর্তা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
আইসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় সংস্থাটির তারল্য সংকট আরও তীব্র হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে, কমে গেছে নতুন বিনিয়োগ সক্ষমতা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই অর্থ মূলত জনগণের কর ও আমানতের টাকাই।
এক আর্থিক বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নেওয়ার বহু উদাহরণ আছে। কিন্তু সি পার্লের ঘটনা ভয়ংকর এজন্য যে এখানে নিরাপত্তাহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিলাসী ব্যবসায় আটকে ফেলা হয়েছে।”
সি পার্লের মালিকপক্ষকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। এর আগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বেঙ্গল ফাইন সিরামিক্স লিমিটেডের কারখানা দখলের অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কয়েকশ লোক নিয়ে কারখানায় প্রবেশ করা হয়। নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা, তবে ব্যবসায়ী মহলে সি পার্ল গ্রুপের “প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক” নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
সূত্র: টিটিএন