পদ দেওয়ার কথা বলে চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারে একটি হোটেলে ডেকে নিয়ে তরুণীর শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক কেন্দ্রীয় নেতা ও নেত্রীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ওই তরুণী। ঘটনা তদন্তে এনসিপির পক্ষ থেকে একটি কমিটি করা হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে শুক্রবার (১৯ জুন) ওই তরুণী চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ির একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
এর আগে গত বুধবার চকবাজার থানায় তরুণী জিডিটি করেন বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদী হাসান সৈকত।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, তরুণী চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রামে এনসিপির সক্রিয় কর্মী।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দীন ও এনসিপির নারী শাখা জাতীয় নারী শক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া আফরিন।
সুজা উদ্দীন বান্দরবান থেকে পার্বত্য আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন। সাদিয়া আফরিন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে এনসিপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
তাদের বিরুদ্ধে জিডিতে বলা হয়, গত ১৪ জুন সন্ধ্যা সাতটার দিকে অভিযুক্তরা ওই তরুণীকে চকবাজারের ‘পেনেনসুলা হোটেলে’র টপ ফ্লোরে এনসিপির কমিটি গঠনসংক্রান্ত আলোচনার কথা বলে ডেকে আনেন।
তিনি সেখানে পৌঁছামাত্র অভিযুক্তরা তাকে রাজনীতিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা তরুণীর সঙ্গে বিভিন্ন অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ প্রদর্শন করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন।
তরুণী ঘটনার প্রতিবাদ জানালে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকিসহ বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান। ঘটনার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগী থানায় জিডির আবেদন করেন।
শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে ওই তরুণী নিজেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, এনসিপির কর্মী ও চট্টগ্রাম মহানগর নারীশক্তির পদপ্রত্যাশী বলে উল্লেখ করেন।
তরুণী বলেন, আমাকে পেনিনসুলা হোটেলের টপ ফ্লোরে যেতে বলেছিলেন সাদিয়া। গত ১৪ জুন সন্ধ্যায় আমি সেখানে যাই। গিয়ে দেখি, সেটা একটি মদের বার। সেখানে সুজা উদ্দীন একটি টেবিলে বসা ছিলেন। তার সঙ্গে আরও দুজন পুরুষ এবং একমাত্র নারী সাদিয়া বসা ছিলেন।
তিনি বলেন, সেখানে বসার পর সুজা ধূমপান ও মদপানে উৎসাহিত করেন। সুজাকে এ সময় মদ্যপ মনে হয়েছে। আমাকে ড্রিংকস অফার করা হয়েছে। কী ড্রিংকস আমি নেব, সেটা জানতে চেয়েছিলেন তিনি।
তরুণী অস্বস্তিবোধ করলে সাদিয়া তাকে ‘সুজা উদ্দিন যেভাবে বলেন, সেভাবে চলার জন্য’ চাপ প্রয়োগ করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়। তিনি বলেন, এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে সাদিয়া চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে উঠে যান। এরপর সুজা কয়েকবার আমাকে তার পাশে গিয়ে বসার জন্য বলেছেন। তার তাকানো এবং অঙ্গভঙ্গি ছিল যথেষ্ট আপত্তিকর, অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক।
অস্বস্তির মধ্যে তরুণী সেখান থেকে উঠে যান বলে জানান। তিনি বলেন, আমি যখন প্রস্তাবে সাড়া দেইনি, তখন সুজা আমাকে বলেন— ডিল অর ডেথ। রাজনৈতিক সুবিধা, পদ-পদবি এবং আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলে আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
এ বিষয়ে গণমাধ্যামের সঙ্গে কথা হয় পেনিনসুলা হোটেলের ব্যবস্থাপক (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) কামাল হোসেনের। তিনি জানান, হোটেলের ১৫ তলায় রুফটপটি বার হিসেবে ব্যবহার হয়। তবে সেখানে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘটিত কোনো ঘটনার বিষয়ে তিনি জানেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মকর্তার জানান, পুলিশ বারে গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে ফোনে কল দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় সুজা উদ্দীন ও সাদিয়া আফরিনের সঙ্গে। তারা কল রিসিভ না করায় হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তা দেখেও তারা কোনো জবাব দেননি।
পরে যোগাযোগ করা হয় এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ইতোমধ্যে ঘটনাটি নিয়ে দলের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।