কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় কেটে ইট ও লোহার কাঠামোয় ৮৮৮টি শেল্টার (ঘর) নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়রা এগুলোকে স্থায়ী আবাসন হিসেবে দেখলেও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) বলছে, এগুলো স্থায়ী নয়, ‘টেকসই’ ঘর। এ নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে; স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নির্মাণকাজের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে পাহাড় কেটে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক তৈরি করা হয়েছে।
আশপাশের টিলাও কেটে সমতল করা হচ্ছে। ইট ও লোহার ব্যবহার থাকায় এসব ঘরকে স্থায়ী কাঠামো হিসেবে দেখছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা। নির্মাণকাজের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় ক্ষোভ বাড়ছে।
অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৪ নম্বর এক্সটেনশন ই ব্লকে।
আরআরআরসি মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করলেও পাহাড়ি জমির পরিমাণ জানাতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫ সালের রমজান মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরের সময় ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে আলোচনার আড়ালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান নির্মাণকাজ সেই পরিকল্পনার অংশ বলে তাঁদের ধারণা।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতায় কিছু এনজিও ও আইএনজিও রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করার চেষ্টা করছে।
তাঁর ভাষ্য, ‘সওয়াব’ নামের একটি এনজিও এই নির্মাণকাজে জড়িত। তিনি দাবি করেন, ইউএনএইচসিআরের বরাদ্দ অর্থে এনজিওটি লোহা ও ইটের কংক্রিটের দোতলা অবকাঠামো নির্মাণ করছে।
তিনি আরো জানান, এর আগে একই এনজিও ক্যাম্পে শেড নির্মাণ করতে গিয়ে বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের প্রায় ১০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছিল। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর সরকারের হস্তক্ষেপে কাজ বন্ধ করা হয়। বর্তমানে নির্মীয়মাণ ৮৮৮টি ঘরের কাজেও একাধিক এনজিও জড়িত থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পাহাড় কেটে স্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হলে তা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করবে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে। দ্রুত কাজ বন্ধ না হলে স্থানীয়রা আন্দোলনে নামবেন বলেও তিনি সতর্ক করেন।
রাজাপালং ইউপির সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্ষার আগে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসসহ বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে।
উখিয়ার রাজাপালং গ্রামের বাসিন্দা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে সহায়ক ভূমিকা রাখা। স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ তাদের ফেরার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাঁশের পরিবর্তে ইট-লোহার ঘর নির্মাণ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এটা রোহিঙ্গাদের স্থায়ী হওয়ার বার্তা যাচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মান্নান বলেন, রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করার যেকোনো উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটা অবিলম্বে বন্ধ না হলে স্থানীয়রা কঠোর কর্মসূচি দেবেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার বন বিভাগের জমি নষ্ট না করে নাফ নদের তীরে রোহিঙ্গাদের শেড তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে শুনেছি। কিন্তু বান্দরবানের সাবেক এমপি বীর বাহাদুর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের পশ্চিমের বন বিভাগের জমিতে রোহিঙ্গাদের শেড নির্মাণে প্রশাসনকে বাধ্য করেন।’
তবে সাবেক এমপি বীর বাহাদুর আত্মগোপনে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে পরিবেশবাদীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এরই মধ্যে কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের বিশাল বনভূমি ধ্বংস হয়েছে এবং এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ চারণভূমি নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে আবাসন নির্মাণ পরিবেশের জন্য আরো বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে এরই মধ্যে আট হাজার একরের বেশি বনভূমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য দখল হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই পরিমাণ কমপক্ষে ১২ হাজার একর।
তবে পাহাড় কেটে স্থায়ী ঘর নির্মাণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানান, পাহাড় কাটার অভিযোগ সঠিক নয়; বিষয়টি যাচাই করে বিস্তারিত জানানো হবে।
আরআরআরসি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পে কিছু শেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে, তবে এগুলো স্থায়ী নয়; ‘টেকসই’ বলা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে সরিয়ে নেওয়া রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য এসব ঘর তৈরি করা হচ্ছে। পাহাড় কাটার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা আমির ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের প্রার্থী মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত কাজ বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ চান।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন ঘর নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, এতে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীকরণের পথ তৈরি হচ্ছে, যা দুঃখজনক।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজার, উখিয়া ও ভাসানচরের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
সুত্র,কালেরকন্ঠ