২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’ সুপারিশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই দিনই জামায়াত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে জাতীয় নির্বাচনের আগে নভেম্বর মাসে গণভোটের দাবি জানায়। ২৯ অক্টোবর দলটি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে মাঠের আন্দোলন কর্মসূচি দেয়। ওইদিনই প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ‘নির্বাচনী প্রস্তুতি সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “এবারের নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। নির্বাচন বানচালের জন্য ভেতর থেকে, বাইরে থেকে অনেক শক্তি কাজ করবে। ছোটখাটো নয়, বড় শক্তি নিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবে।”
প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে দেশের ভিতর ও দেশের বাইরের শক্তি কারা? অন্তর্বর্তী সরকার তাদের চিহ্নিত করছে না কেন? দীর্ঘ ১৫ বছর পর দেশের মানুষ নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। নির্বাচন বানচালের দেশি–বিদেশি শক্তিকে দমন করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় বইছে।
অনেকেই নির্বাচন বানচালের সঙ্গে লাভক্ষতি এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিদেশি মিডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকার, ভারতের নীল নকশা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবির যোগসূত্র খুঁজছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরেও উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পদ–পদবিধারী কেউ কেউ নির্বাচন পেছানোর বাহানায় তৎপর বলেও অভিযোগ করছেন। প্রধান উপদেষ্টা আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান দেখালেও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে তার কানভারী করছেন—এমন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের অনুষ্ঠিবত্য নির্বাচন বানচালের নেপথ্যের ডেভিল কারা? নির্বাচন বানচালে তাদের কী স্বার্থ? নির্বাচন বানচালের নেপথ্যে ডেভিলদের সঙ্গে বাংলাদেশের শত্রুরাষ্ট্র ভারত ও পলাতক শেখ হাসিনার যোগসূত্র কোথায়?
নির্বাচন বানচালের ডেভিলদের সঙ্গে ভারত ও খুনি হাসিনার সম্পর্ক খুঁজতে সোশ্যাল মিডিয়ার নেটিজেনরা ঘাম ঝরাচ্ছেন। “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”—কবি গোলাম মোস্তফার ‘ভবিষ্যতের স্বপ্ন’ নামক কবিতার এই পংক্তি এক নেটিজেন তুলে ধরেছেন। ওই পোস্টকে নিয়ে একজন লিখেছেন, “১৯৬৪ সালে মৃত্যু হলেও বহু ইসলামী কবিতার লেখক গোলাম মোস্তফা কবিত্বের গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পেরেই এমন কবিতা লিখেছেন।”
পিআর–গণভোট নিয়ে আন্দোলনের শিশুর পিতার মতোই (জামায়াত) দীর্ঘ এক যুগ আরেক শিশু (আওয়ামী লীগ) অন্তরে ঘুমিয়ে ছিল। ২০১৪ সাল থেকে বিএনপি যখন মাঠেঘাটে আওয়ামী লীগ বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে, তখন জামায়াত–শিবির কবির ভাষায় আরেক শিশু আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগের পেটেই ঘুমিয়ে ছিল। এমনকি রাজপথে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আন্দোলন ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর কাকরাইলে বিএনপির সমাবেশে আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগের সশস্ত্র আক্রমণে কয়েকজন প্রাণ হারায়। ওই দিনও নটরডেমের সামনে জামায়াত নির্বিঘ্নে বিনা বাধায় মহাসমাবেশ করেছে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এক শিশুর অন্তর (ছাত্রলীগ) থেকে আরেক শিশু (শিবির) বের হয়ে আসে। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ছাত্রশিবিরের আবির্ভাব ঘটে। দেখা গেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের এই নেতারা এতদিন ক্যাম্পাসে ফ্যাসিস্ট ছাত্রলীগেই সক্রিয় ছিলেন। যার কারণে বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যামামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ আসামির পক্ষে শিবিরের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘাড়ে সওয়ার হয়ে জামায়াত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে (মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্পোরেশন, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর) অনুসারী আমলাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর সুচতুরভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার এবং দেশের নতুন পথচলা ইত্যাদি প্রচারের মাধ্যমে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কার্পেটের নিচে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে।
জামায়াতের এই চালাকি ধরা পড়ায় সতর্ক হয়ে যায় এনসিপি। অতঃপর জামায়াত ফের শুরু করে নতুন খেলা। শিশুর মতোই জামায়াত বিগত এক যুগ যে শিশুর (আওয়ামী লীগ) অন্তরে ঘুমিয়ে ছিল, সেই শিশুর প্রত্যাশা পূরণের (পুনর্বাসন) চেষ্টা এখন মাঠে নেমেছে। দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্করা আওয়ামী লীগকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনর্বাসনের নীল নকশা করে। সে নীল নকশা অনুযায়ী প্রথমে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) ভোটের দাবি তোলা হয়।
এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ২০ শতাংশ ভোটের রেশিও অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ৬০ আসন পাবে। এ জন্যই হঠাৎ করে জামায়াত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি তুলে মাঠ গরম করার পথ নেয়। কিছুদিন এ দাবিতে সভা–সমাবেশ, মহাসমাবেশ এবং উত্তাপ ছড়িয়ে ব্যর্থ হয়। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি মাঠে মারা যাওয়ায় দিল্লির দ্বিতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে এখন দলটি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
এ দাবিতে দেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অলিগার্ক হিসেবে চিহ্নিত ইসলামী আন্দোলনসহ ৮টি দলকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এখন দিল্লির এজেন্ডা জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে আন্দোলন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে এরা অশ্রুপাত করছে। এ যেন ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ প্রবাদের মতোই।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলের শেষ দিকের ১২ বছর যাদের জনগণের দাবির পক্ষে রাস্তায় দাঁড়াতে দেখা যায়নি; যে দলের ছাত্রনেতাকর্মীরা মুজিব কোট গায়ে জড়িয়ে ছাত্রলীগের লাঠিয়াল বাহিনী, হেলমেট বাহিনী হিসেবে ছাত্রজনতার উপর জুলুম নির্যাতন করেছে; তারা এখন অধিক দেশপ্রেমিক হয়ে উঠে গণভোট আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য মায়াকান্না করছে। “আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই”—স্লোগানে কি বিচিত্র রাজনীতি ইসলামী ধারার জার্সিধারী দলটির!
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মডারেট ইসলামী দল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে হিন্দুত্ববাদী ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এ খেলা আর কতদিন চলবে?
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বানচালের দেশি–বিদেশি ষড়যন্ত্র যখন চলছে তখন বিএনপি এর তীব্র বিরোধিতায় নেমেছে। গতকালও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি ‘অযৌক্তিক এবং অবিবেচনাপ্রসূত’ অভিহিত করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের দিন ছাড়া বিএনপি কোনোভাবেই গণভোটের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। জুলাই সনদের কপি হাতে আসার পর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্মত কয়েকটি দফা আমাদের অগোচরে পুনরায় সংশোধন করা হয়েছে। এই মনগড়া প্রস্তাব গ্রহণ করলে সেটা জাতিকে বিভক্ত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি জাতির সঙ্গে প্রহসনমূলক ও প্রতারণা।”
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করে জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “আমরা জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট চাই। গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাই। এটা খুব পরিষ্কার। অনেকগুলো সেটেল্ড ইস্যুকে নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এবং মহল থেকে নানা রকম বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার, ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে নির্বাচনের পরিবেশ এবং রাজনীতিতে একটা উত্তাপ ছড়ানো হচ্ছে। পাঁয়তারা করার চেষ্টা করছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. প্রফেসর আসিফ নজরুল বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ তীব্রতম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এসব ব্যাপারে একটা সময় সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণভোট বাস্তবায়নের উপায় এবং গণভোট কবে হবে, তা প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকবে।”
২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’ প্রধান উপদেষ্টার হাতে হস্তান্তর করে। জুলাই সনদে সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশ রয়েছে ৮৪টি। আর সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব আছে ৪৮টি। এর মধ্যে ৩৬টি প্রস্তাব নিয়ে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত আছে।
সুপারিশে গণভোটের প্রস্তাবনা দেয়া হয় এবং গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে হবে নাকি নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হবে, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে দেয়া হয়। অতঃপর জামায়াতসহ কিছু শক্তি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন পেছানোর লক্ষ্যেই নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করা হচ্ছে। ভারত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে প্রথমে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন ও এখন জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবির ফাঁদ পেতেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ এক যুগ নীরবতা পালন করা জামায়াত হঠাৎ করে একের পর এক দাবি নিয়ে মাঠে নামছে কেন? কার পক্ষে জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে খেলছে?
এমন প্রশ্নের নানামুখী জবাব খুঁজে পাওয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের বক্তব্যে। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ ৮টি দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করছে। এর নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের পেট থেকে ছাত্রশিবিরের বের হয়ে আসা এবং জামায়াত অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া এনসিপি নেতাদের আয়োজিত সভা–সমাবেশে লোক সরবরাহ করে অনুকম্পা আদায় করে।
এনসিপির গঠনের আগ থেকে ছাত্রনেতারা যে সব কর্মসূচি দিয়েছে, প্রতিটি কর্মসূচিতে মাঠ ভরে দিয়েছে জামায়াত–শিবির নেতাকর্মীরা। এতে ছাত্রনেতাদের আশীর্বাদের হাত পড়ে জামায়াতের উপর। সে সুযোগ নিয়ে দলটি প্রশাসনে জামায়াত অনুগত আমলাদের পদায়ণ ও প্রমোশন দেয়। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেক্টর জামায়াত অনুগতদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
জাতীয় নির্বাচন যতই পেছাবে এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ বিলম্বিত হবে, ততদিন প্রশাসন জামায়াত অনুগতদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেদারল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে যাদের হায়ারে এনে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে এবং বিভিন্ন এনজিওর কর্মকর্তাদের পদ–পদবিতে বসানো হয়েছে, তাদের ভোগবিলাসের সময় দীর্ঘায়িত হবে।
এছাড়াও পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি ও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবির নেপথ্যে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী ভারত। আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে যখন স্টিমরোলার চালিয়েছে, তখন জামায়াত গর্তে ছিল এবং শিবির গিরগিটির মতো রং বদলে হয়েছিল ছাত্রলীগ। তখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর পৃষ্ঠপোষকতায় চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পায়।
ড. কামাল হোসেনকে হায়ারে এনে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে নির্বাচনে মাঠে দেখা গেছে ভোটের প্রচারণায় কেবল আওয়ামী লীগের নৌকা আর চরমোনাই পীরের দলের হাতপাখা। ধানের শীষের মতো প্রতীক কোথাও টানাতে দেয়া হয়নি, অথচ ক্ষুদ্র দল ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীক সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
ওই সময় দলটির তেমন নেতাকর্মী না থাকলেও ‘র’ কার্যত হাতপাখার পোস্টার সারাদেশের আনাচে–কানাচে লাগিয়েছিল। সেই ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াত রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় বিপরীতমুখী হলেও দিল্লির নীল নকশা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জোট করেছে। এটা করতে গিয়ে প্রচুর অর্থের লোভ সংবরণ করতে না পেরে কিছু ইসলামী দলও ওই জোটে শরিক হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের মহিলাদের মুখে প্রায় একটি প্রবাদ শোনা যায়—“টাকায় করে কাজ, মিছে মর্দের নাম।” এই প্রবাদের অর্থ হলো, টাকা থাকলে অনেক কাজ হয়ে যায়, কিন্তু টাকা না থাকলে একজন মানুষের সম্মান বা মর্দের নাম বৃথা যায়। পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি মাঠে মারা যাওয়ার পর এখন জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবির আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ওই টাকা।
দেশের মানুষ যখন নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে, নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গণভোট ইস্যুতে দেশের রাজনীতি জটিল সমীকরণে ধাবিত। বিশেষ করে গণভোট ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
‘নোট অব ডিসেন্ট’ সুপারিশে লিপিবদ্ধ না করা এবং গণভোটের সময় নিয়ে বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ে উঠলেও এখন তাতে অনৈক্য প্রকাশ্য। দিল্লিতে নিরাপদে থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা একের পর এক দেশবিরোধী হুংকার দিচ্ছে। মাথা থেতলে যাওয়া সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি নাজুক। নির্বাচিত সরকার ছাড়া বিদেশিরা বিনিয়োগ করবে না—এটা জানিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন অপরিহার্য। বেকারত্ব আর আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় মানুষের যাপিত জীবন দায় হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি ষড়যন্ত্র।
এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধান সংশোধনের যে ৪৮ সুপারিশ করেছে, তার ৩৬টি সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে। এমন অবস্থায় গণভোট জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত ‘হাঁ’ ভোটের চেয়ে ‘না’ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতি হলে সংকট আরও বাড়বে। ফলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল।