
মক্কা থেকে মদিনা। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফর– ‘হিজরত’। এই দীর্ঘ পথচলায় নবী কারিম (সা.) এবং তাঁর পরম বন্ধু আবু বকর (রা.) এমন কিছু স্থানে পদধূলি দিয়েছেন, যা আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হিজরতের চতুর্থ দিনে এমনই এক স্মৃতিবিজড়িত স্থানের নাম ‘সখরাতুন ত্বয়িলা’ বা দীর্ঘ প্রস্তরখণ্ড।
ওয়াদিয়ে ইবরাহিমের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এই স্থানটিতেই ক্লান্ত নবীজি (সা.) ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলেন। মরুভূমির তপ্ত বালু আর প্রখর রোদ উপেক্ষা করে তাঁরা এগিয়ে চলছিলেন। মক্কার পরিচিত পথ এড়িয়ে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এক অপরিচিত ও দুর্গম পথ ধরে তাঁরা চলছিলেন, যাতে কুরাইশরা তাঁদের নাগাল না পায়।
চলতে চলতে দুপুর গড়িয়ে আসে। আরব উপদ্বীপের দুপুরের রোদ তখন আগুনের মতো ঝরছে। হজরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল হয়ে উঠলেন নবীজির (সা.) একটু বিশ্রামের জন্য। তিনি চারপাশটা ভালো করে দেখলেন, কোথাও একটু ছায়া পাওয়া যায় কি না।
হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল একটি বিশাল লম্বা পাথর বা চাতাল। এটিই ইতিহাসের পাতায় ‘সখরাতুন ত্বয়িলা’ নামে পরিচিত। পাথরটির গঠন এমন ছিল যে, সূর্যের অবস্থান বদলালেও এর নিচে কিছুটা ছায়া অবশিষ্ট থাকত।
সহিহ বুখারির ও সিরাত গ্রন্থগুলোর বর্ণনায় এই স্থানের ঘটনাটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। হজরত আবু বকর (রা.) পাথরটির কাছে গিয়ে দেখলেন, সেখানে সামান্য ছায়া আছে। তিনি দ্রুত গিয়ে নিজের হাত দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করলেন। এরপর নিজের গায়ের চাদর বা চামড়ার জোব্বা বিছিয়ে দিলেন, যাতে নবীজি (সা.) আরাম করতে পারেন।
তিনি নবীজিকে (সা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি একটু বিশ্রাম নিন, আমি চারপাশটা দেখে রাখছি।
নবীজি (সা.) ক্লান্ত শরীরে সেই পাথরের ছায়ায় শুয়ে পড়লেন। এই সেই পাথর, যা বিশ্বনবীকে (সা.) নিজের ছায়ায় আগলে রাখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল।
নবীজি (সা.) যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন আবু বকর (রা.) দেখলেন একজন রাখাল বকরির পাল নিয়ে আসছে। তিনি রাখালকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বকরির ওলানে কি দুধ আছে? রাখাল ইতিবাচক জবাব দিলে আবু বকর (রা.) তাকে দুধ দোহন করতে বললেন।
রাখাল অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে দুধ দোহন করল। আবু বকর (রা.) সেই দুধে সামান্য পানি মিশিয়ে তা ঠান্ডা করলেন এবং নবীজি (সা.)-এর খেদমতে পেশ করলেন। ঘুম থেকে জেগে নবীজি (সা.) সেই দুধ পান করলেন। আবু বকর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন, যা দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম।
‘সখরাতুন ত্বয়িলা’ বা এই দীর্ঘ পাথরটি কেবল একটি জড় পদার্থ নয়; এটি নবীপ্রেম ও সাহাবী আবু বকর (রা.)-এর অকৃত্রিম ভালোবাসার এক উজ্জ্বল সাক্ষী। ওয়াদিয়ে ইবরাহিম বা হিজরতের এই রুক্ষ পথেই রচিত হয়েছিল ইসলামের বিজয়ের প্রাথমিক নকশা। হিজরতের স্মৃতিচারণ করতে গেলে এই পাথরের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীবের জন্য তপ্ত মরুভূমিতেও প্রশান্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।