কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল আয়তনজুড়ে নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ বাউন্ডারি। বনের মাঝে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথে এমন বিশাল ও উঁচু বাউন্ডারি নির্মাণ হলে বন ও বন্যপ্রাণী মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে চরম হুমকিতে পড়তে পারে বন ও জীববৈচিত্র্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া এলাকাস্থ ২৬ নম্বর শালবাগান ক্যাম্পের প্রান্তসীমায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে বিশাল আয়তনের একটি সুউচ্চ বাউন্ডারি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, নির্মাণাধীন বাউন্ডারিটির উচ্চতা হবে প্রায় ১০ ফুট এবং এর দৈর্ঘ্য (রাউন্ডিং ফুট) হবে অন্তত ১ হাজার ফুট।
নির্মাণ কাজে নিয়োজিত এক প্রতিনিধি জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউএনডিপি সরাসরি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বনের ভেতরে এত বিশাল এলাকাজুড়ে সুউচ্চ বাউন্ডারি নির্মাণ জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হবে। পাশাপাশি এটি ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের জন্যও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এই বাউন্ডারিকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান ও নেচার পার্ক এলাকাস্থ সংরক্ষিত বনে প্রায় ২৮৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। একসময় এসব প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ থাকলেও, রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের ফলে তাদের আবাসস্থলে পরিবর্তন এসেছে। অনেক প্রাণী এখন বনের গভীরে সরে গেছে, আবার কিছু প্রাণী অন্যত্র চলে গেছে। ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
বন ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, লেদা থেকে শালবাগান ও নেচার পার্ক পর্যন্ত এলাকা পশুপাখির গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্য ও খাদ্যসংস্থান কেন্দ্র। যদিও রোহিঙ্গাদের চলাচলের কারণে প্রাণীরা এখন গহীন বনে আশ্রয় নিচ্ছে, তবুও এসব এলাকায় তাদের বিচরণ এখনো রয়েছে।
টেকনাফ রেঞ্জের বন পাহারা দলের সদস্যরা জানান, মুচনী বিট এলাকায় এখনো বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বনমোরগ, হাতি ও বিভিন্ন সরীসৃপ প্রাণীর দেখা মেলে। তবে রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন্যপ্রাণীর জন্য বনাঞ্চল অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ফলে তারা গভীর বনে আশ্রয় নিচ্ছে, যেখানে একদিকে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে নিরাপদ আবাসের অভাব দেখা দিয়েছে। এতে টেকনাফের বন ও বন্যপ্রাণী মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
এ অবস্থায় শালবাগান এলাকার বনের মাঝখানে এত বড় ও উঁচু বাউন্ডারি নির্মাণ করা হলে প্রায় ২০০টির বেশি বন্যপ্রাণীর চলাচল ব্যাহত হবে। এছাড়া বনের ভেতরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করা হলে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
মোখতার নামের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার বাউন্ডারির দুই পাশে পাহাড় থাকায় মোট দৈর্ঘ্য এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।” রোহিঙ্গাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখানে সবাই কাজ করছেন।” পরে তিনি সরেজমিনে এসে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই ‘এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ)’ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
অন্যদিকে, ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে আরআরআরসি ও ইউএনডিপির সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
এ বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এত বড় বাউন্ডারি নির্মাণের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে তিনি জানান, এমন স্থাপনা নির্মাণ বনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হবে এবং অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সূত্র: উখিয়া নিউজ।