একদিকে সংসারের খরচ, অপরদিকে একমাত্র পুত্র সন্তানের ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তার উপর চলে গেছে চাকরি। এযেন এক অসহায় পিতার সামনে অসাধ্য সাধনের পরীক্ষা। যেকারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করা ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মুহাম্মদ আহমদ উল্যাহ রিকশাও চালিয়েছেন।
দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকের কাজ করেছেন। জটিল রোগে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসার জন্য বেকার সহকর্মীদের কাছে ভিক্ষাও চেয়েছেন। কিন্তু বেকার থাকার কারণে কারো কাছে মোটা অংকের টাকা ধার চাওয়ার সাহস করতে পারেননি তিনি।
যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তার আট মাস বয়সী পুত্র সন্তান আরিয়ান আহমেদ আরাফ গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চোখ মুছতে মুছতে খবরের কাগজকে কথাগুলো বলছিলেন ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মুহাম্মদ আহমদ উল্যাহ।
তিনি জানান, সবাই জানে ইসলামী ব্যাংক আমাকে চাকরিচ্যুত করেছে। আমি বেকার হয়ে গেছি। এই মুহুর্তে আমাকে সন্তানের চিকিৎসার জন্য এত বড় অংকের ঋণ কেই বা দেবে? শেষ পর্যন্ত যথাযথ চিকিৎসার অভাবে আমার আদরের সন্তান না ফেরার দেশে চলে গেল।
গত বছরের ৫ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংক থেকে তাকে বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। তখন তিনি ব্যাংকটির জামালুপুরের ইসলামপুর শাখার ট্রেইনি এ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে প্রথমে ঢাকার মিরপুর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে যোগদান করেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালের ৫ মে ইসলামী ব্যাংকে যোগদান করেন।
পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা ও এক পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জনক আহমদ উল্যাহ জানান, যেদিন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় সেদিন তার ছেলে সন্তানের বয়স ছিল মাত্র ১৩ দিন। চাকরি হারানোর কারণে তখনও তিনি ততটা ভেঙ্গে পড়েননি। ধারণা ছিল নতুন করে চাকরি খোঁজার চেষ্টা করবেন। যেহেতু শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে নিশ্চয় কোথাও না কোথাও একটা চাকরি হয়ে যাবে। যা দিয়ে সংসার চলে যাবে। কিন্তু কয়েক দিন না যেতেই ছেলে আরাফ আহমেদ আরিয়ান ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখনও খুব একটা ভেঙ্গে পড়িনি। ধারণা ছিল সাধারণ রোগ-ব্যাধি। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা যখন জটিল হচ্ছিল তখন চরম বিপাকে পড়ে যাই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যখন আইসিইউ এর প্রয়োজন হল। তখন নিজেকে চরম অসহায় মনে হল। চাকরিটা থাকলে মনের মাঝে একটা শক্তি থাকতো। মাস শেষে পাওয়া বেতনের টাকা সন্তানের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে পারতাম। সেই চাকরির উপর ভর করে ঋণ নিয়ে ছেলের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারতাম। চোখের সামনে আমার ছেলেটা চলে গেল। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তাকে বাঁচানোর জোরালো চেষ্টাও করতে পারলাম না। কারণ প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ নেই। অপরদিকে, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড ম্যানেজ করতে পারলেও হাম রোগের প্রকোপের জন্য ভর্তি করাতে ডাক্তাররা কিংবা নিজে রাজি ছিলাম না। ডাক্তার, নার্সরা বাইরেৱ কোনো প্রাইভেট ভালো হাসপাতালের আইসিউতে ভর্তির জন্য বারংবার তাগাদা দিচ্ছিল। কিন্তু আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম ঐ চাকরিচ্যুতিজনিত আর্থিক অক্ষমতার কাছে। শেষে সহকর্মীদের কাছে হাত পেতেছিলাম। তারাও তো বেকার। তবুও অনেকেই এগিয়ে এসেছিলেন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার সন্তানের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে গেছে। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে সাড়ে ৮টার দিকে আল্লাহ এর ডাকে সাড়া দেয়। ছয় বছর বয়সী আমার একমাত্র মেয়ে আসফিয়া আহমেদ আশিফা ক্ষণে ক্ষণে ছোট ভাইকে খুঁজছে। তার মা তো সন্তানের শোকে পাগল প্রায়।
সহকর্মীদের কাছে লেখা সাহায্যের আবেদনে আহমদ উল্যাহ লিখেন। “কখনও ভাবিনি এভাবে আপনাদের কাছে আসতে হবে। জালিম ম্যানেজমেন্টের জুলুমের কারণে শুধু পথে বসিনি, আমার বাচ্চার জীবন আজ অনিশ্চয়তার মুখে। খুবই নাজুক অবস্থা। ইউরিন ইনফেকশন, নিউমুনিয়া এবং অন্যান্য সমস্যা নিয়ে গত গত ২৯ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত আমার বাচ্চা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যাওয়ার দুইদিন পর বাচ্চার আবার সমস্যা দেখা দেয়। ডাক্তারকে দেখানোর পর ডাক্তার আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ একাধিক পরীক্ষা দেয়। ১১ মে চিকিৎসকরা জানান, বাচ্চার মূত্রনালীতে জন্মগতভাবে পর্দা আছে এবং এর কারণে প্রস্রাব আসতে না পারায় মূত্রনালী ও কিডনী নালী ফুলে গেছে। কিডনিদুটোই অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে। ডান কিডনিতে ডুপ্লিকেট কিডনি দেখা যাচ্ছে এবং কিডনি দুটি বড় হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় জরুরিভাবে অপারেশন লাগবে। পাশাপাশি কিডনির ট্রিটমেন্ট চালিয়ে নিতে হবে। এই অপারেশনসহ ট্রিটমেন্ট খরচ আনুমানিক লক্ষাধিক টাকা। বেকার ও সঞ্চয় না থাকার কারণে আমি বাচ্চার জীবন নিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলাম। তাই আপনাদের সহযোগিতার দ্বারস্থ হলাম। আপনারা সবাই জনপ্রতি ১০ টাকা করে ভিক্ষা হিসেবে দিলেও আমার মোটামুটি একটা সাপোর্ট হয় যদিও আমরা সবাই বেকার।”
চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের প্ল্যাটফর্ম চিটাগং এলাইয়েন্স এর সমন্বয়ক এবং মুখপাত্র মোহাম্মদ মোক্তার রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, অর্থাভাবে শুধু আহমদ উল্যাহর শিশুপুত্র বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছে তা নয়। ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত আরো অনেক কর্মকর্তা আছেন যাদের চাকরির বয়স চলে গেছে। এখন অন্য কোথাও চাকরিতে যোগদানের বয়স নেই। কিন্তু সংসারের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের বয়স্ক এবং অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসা করাতে পারছে না। চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব তারা।