টানা অতিবৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ধসের ঘটনায় আট ছাত্রী নিহত। পাহাড় ধসের পর উদ্ধার করা হয় ১৪ জনকে। তাদের মধ্যে ৮ জন মারা যায়। আর আহত ৫ জনকে ক্যাম্পের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বুধবার (৮ জুলাই) বেলা ৩টার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর ব্লক এ ৭/৩ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ক্যাম্প-৫ পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন ঘটনাস্থলেই এবং অপর ৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
অবশিষ্ট ৫ জন শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে (GK) হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি (IRC) হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।
“ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে এবং সিসিসিএম (CCCM) স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় পরিচালিত উদ্ধার অভিযান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ঘটনাস্থলে এপিবিএন (APBN) সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন এবং পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেছেন আরআরআরসি (RRRC) কর্মকর্তারা” জানান আরআরআরসি।
প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা একে মোহাম্মদ সাদেক জানান, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদ্রাসা এবং তার ওপরে একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল ধসে মাদ্রাসাটির ওপর পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজন নিহত হন।
রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে নিহত হন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস।
একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহত হন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।”
এছাড়া একইদিন কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা ও পেকুয়ায় এবং পরদিন দরিয়ানগর এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার (আশ্রয়কেন্দ্র) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৮৭২-৬১৫১৩২-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সূত্র: টিটিএন