আজ ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ঘেরা বিস্তীর্ণ জনপদে প্লাস্টিক আর বাঁশের ছাউনির নিচে আরও একটি নির্বাসিত বছর পার করল বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হয়ে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠীর সংকটের ৯ বছর পূর্ণ হতে চলল। এই বিশেষ জীবনের এক চরম অনিশ্চিত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এবং মানবিক সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি পুনর্ব্যক্তের প্রাক্কালে (১৮ জুন) ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) তাদের অংশীদারিত্ব নবায়ন করে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৪ কোটি (১৪ মিলিয়ন) ইউরো অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই আন্তর্জাতিক সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও চার দশকের ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ, রাখাইনের বর্তমান জটিল ভূ-রাজনীতি, ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ অপরাধ সিন্ডিকেট এবং স্থানীয় পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের সামনে এক স্থায়ী, জটিল ও ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
চার দশকের অনুপ্রবেশের ইতিহাস:
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন কোনো সা¤প্রতিক ঘটনা নয়, বরং এটি চার দশকের এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ধারাবাহিকতা। ইতিহাস ও ডেটা বিশ্লেষণ করলে প্রধানত তিনটি বড় ধাপে এই অনুপ্রবেশের চিত্র দেখা যায়: প্রথম ধাপ (১৯৭৮ ও ১৯৯১-৯২): বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রথম বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটে ১৯৭৮ সালে। তৎকালীন মিয়ানমার সামরিক জান্তা পরিচালিত ‘অপারেশন নাগামিন’ বা ‘কিং ড্রাগন’ নামক জাতিগত নিধন অভিযানের মুখে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তাদের একটি বড় অংশ ফিরে গেলেও ১৯৯১-৯২ সালে রাখাইন রাজ্যে আবারও বড় বিপর্যয় নেমে আসে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তীব্র নিপীড়ন, জোরপূর্বক শ্রম খাটানো এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে এ সময় দ্বিতীয় দফায় আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০১২-২০১৬): এর পর দীর্ঘ সময় ছোট আকারে অনুপ্রবেশ চলতে থাকলেও ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জেরে আবারও হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এর চেয়েও বড় ধাক্কা আসে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে।
রাখাইনের কয়েকটি সীমান্ত চৌকিতে হামলার অজুহাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে বর্বরোচিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে। সামরিক জান্তার সেই দফার নৃশংসতায় প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপ (২০১৭): সর্বশেষ এবং ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ঘটে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যা, গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং চরম নৃশংসতার মুখে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। পূর্বের বিভিন্ন সময়ে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা সরকারি হিসাবে প্রায় সাড়ে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে।
রাখাইনের নতুন যুদ্ধ ও প্রত্যাবাসনের জটিল সমীকরণ:
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনটি ঘটছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। রাখাইনে মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যে চলমান যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। রাখাইনের সিংহভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে চলে গেছে।
এই পরিস্থিতি এক নতুন দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে। একদিকে জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে লোকদেখানো প্রত্যাবাসনের নাটক করতে চায়, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে বা তাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করার প্রশ্নে এখনো ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি এই অরাষ্ট্রীয় শক্তি বা ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ আরাকান আর্মির সঙ্গে কোনো ধরনের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় যাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা। কারণ মাঠের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো রোহিঙ্গাই রাখাইনে ফিরতে নিরাপদ বোধ করবে না।
সম্প্রতি (১৭ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা চলছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো শরণার্থীকে জোরপূর্বক বা অনিরাপদ পরিবেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তবে আমাদের সরকার রাখাইন রাজ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সে লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা সময়সীমা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুক‚লে আসার সাথে সাথেই যাতে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়, সেজন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রাখা হয়েছে। উপযুক্ত সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
তহবিল সংকট বনাম ক্যাম্পের নিরাপত্তা:
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং বিশ্বজুড়ে ইউক্রেন ও গাজা সংকটের মতো নতুন সংঘাত তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক দাতাদের নজর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কিছুটা সরে গেছে। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের ( (জেআরপি) আওতায় ৯১০.৫ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তার আহ্বানের বিপরীতে এ পর্যন্ত মাত্র ২৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে। সাহায্য কমে যাওয়ায় কর্মহীন ও শিক্ষাবঞ্চিত বিশাল তরুণ প্রজন্মকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র অপরাধী চক্র। আরসা আরএসও এবং স্থানীয় ডাকাত দলের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল, টার্গেটেড কিলিং ও মাদক চোরাচালান এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে সরকারের কঠোর নজরদারি ও বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযানের ফলে গত তিন বছরে ক্যাম্পে খুনের ঘটনা রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। ২০২৩ সালে খুনের ঘটনা ৬৮টি হলেও ২০২৪ সালে তা ৪৯টি, ২০২৫ সালে ৩৫টি এবং চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে মাত্র ৬টিতে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইইউ-এর নতুন ১.৪ কোটি ইউরোর অনুদান মূলত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও রান্নার এলপিজি সরবরাহে ব্যয় হবে, যা অপরাধপ্রবণতা কমাতে কিছুটা ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি:
২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গার আকস্মিক অনুপ্রবেশ এবং পরবর্তীতে শরণার্থী শিবির স¤প্রসারণের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলের পরিবেশ, বনভূমি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির স্থাপনের ফলে প্রায় ১২ হাজার একরেরও বেশি সংরক্ষিত ও সামাজিক বনাঞ্চল সম্পূর্ণ উজাড় হয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে বনের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প হিসেবে এলপিজি গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ইতিমধ্যে শত শত পাহাড় কেটে সমতল করায় বর্ষা মৌসুমে তীব্র পাহাড়ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে এবং ধুয়ে আসা মাটিতে স্থানীয় খাল-ছড়াগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও, যার ফলে ঐতিহ্যগত ‘এশিয়ান এলিফ্যান্ট’ করিডোর অবরুদ্ধ হয়ে হাতির আক্রমণে এ পর্যন্ত অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের বিশাল পানির চাহিদা মেটাতে ১০ হাজারের বেশি গভীর নলক‚প দিয়ে প্রতিদিন মাটির নিচ থেকে লাখ লাখ গ্যালন পানি তোলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে, যা পুরো উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ, বাড়ছে সামাজিক সংকট:
সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের
সহানুভূতির স্থানটি দখল করছে তীব্র ক্ষোভ ও উষ্মা। টেকনাফ ও উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা এখন নিজেদের জন্মভূমিতেই সংখ্যালঘু।
কেবল ত্রাণের রাজনীতি নয়, চাই টেকসই সমাধান:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে তাদের নিজ দেশে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। তবে ইউক্রেন ও গাজা সংকটের মতো নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিতে রোহিঙ্গা সংকটটি যেন পেছনের সারিতে চলে গেছে, যেখানে বিশ্ব স¤প্রদায়ের ভূমিকা এখন কেবল ‘বার্ষিক তহবিল ঘোষণা’ এবং প্রথাগত ‘উদ্বেগ প্রকাশ’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সূত্র: দৈনিক পূর্বকোণ