
পেকুয়ার সঙ্গে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার যোগাযোগের প্রধান নৌ-দ্বার মগনামা টার্মিনাল জেটিঘাট। এটি বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সাগরের ঢেউয়ে পিলার, রেলিং ও পাটাতন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় জেটিঘাটের বিভিন্ন অংশে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জেটিঘাট ও নৌপারাপার ইজারা থেকে বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট সংস্কারে উদ্যোগ নিচ্ছে না কক্সবাজার জেলা পরিষদ।
সরেজমিন দেখা গেছে, জেটিঘাটের একাধিক সিঁড়ি মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইজারাদার অস্থায়ীভাবে কাঠের তক্তা বসিয়ে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামার ব্যবস্থা করছেন। কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মফজল করিম বলেন, ‘জেটিতে উঠতে গেলেই মনে ভয় কাজ করে– এই বুঝি ভেঙে পড়ল।’
সম্প্রতি মগনামা জেটিঘাট পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। তিনি জানান, জেলা পরিষদের বরাদ্দে জেটিঘাটের সংস্কারকাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মগনামার বাসিন্দা ইমরান বলেন, ‘একসময় মগনামা জেটিঘাট পেকুয়া ও কুতুবদিয়ার দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এখন তা বেহাল অবস্থায় রয়েছে। অযত্ন ও অবহেলায় এই জেটিঘাট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ চট্টগ্রামে কর্মরত কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মুবিনুল হক বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটিতে নিয়মিত বাড়িতে আসা-যাওয়া করি। মগনামা জেটিঘাট ব্যবহার করতে গিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। বিশেষ করে ঈদসহ নানা ছুটিতে যাত্রীর চাপ বাড়লে জেটিঘাট ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।’
মগনামা জেটিঘাট ব্যবহার করে প্রতিদিন কুতুবদিয়ার হযরত মালেক শাহ (রহ.)-এর মাজারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার যাত্রীরা চলাচল করেন। একই সঙ্গে কক্সবাজার ফিশারিঘাট, মহেশখালী ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকাগুলোর সঙ্গে কুতুবদিয়াবাসীর যোগাযোগে এই ঘাট গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত মাছ পরিবহন ও বিপণনের অন্যতম কেন্দ্রও মগনামা জেটিঘাট। এ ছাড়া কুতুবদিয়া চ্যানেলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বহু পর্যটক এই ঘাট দিয়ে চলাফেরা করেন।
জানা যায়, ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে মগনামা জেটিঘাট নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাটটি নির্মাণ করে কক্সবাজার জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর জেটিঘাট ও নৌপারাপার ইজারা দিয়ে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করলেও প্রায় দুই দশকে কার্যকর কোনো সংস্কার হয়নি। ইজারাদার কর্তৃপক্ষ ও নির্মাণকারী সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের জটিলতার কারণে সংস্কার কার্যক্রম বারবার থমকে গেছে। এর ফলে জেটিঘাটের অবস্থা দিনদিন করুণ হয়েছে।
মগনামা ঘাটকে কেন্দ্র করে কুতুবদিয়া প্রান্তে দরবার লঞ্চঘাট, বড়ঘোপ টার্মিনাল, সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল, আলী আকবর ডেইল ও আকবর বলি—এই পাঁচটি জেটিঘাটে নৌযান চলাচল করে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব জেটিঘাট ও নৌপারাপার ইজারা থেকে সরকার বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। বর্তমানে মগনামা থেকে বড়ঘোপ ও দরবার লঞ্চঘাট রুটে স্পিডবোট ও ডেনিস বোট চলাচল করছে। যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার পাশাপাশি ঘাট ব্যবহার বাবদ অতিরিক্ত ফি আদায় করা হলেও ঘাটের অবকাঠামোগত কোন উন্নয়ন নেই।
অন্যদিকে, আলী আকবর ডেইল জেটিঘাট ইতোমধ্যে ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। বড়ঘোপ জেটিঘাটও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব জেটিঘাট ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। অনেক সময় নৌযানে ওঠানামার সময় দুর্ঘটনাও ঘটছে।
ইজারাদার নুরুল ইসলাম বলেন, দ্রুত সংস্কার না হলে যেকোন সময় জেটিঘাট পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসে আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘জেলা পরিষদের একটি দল জেটিঘাটের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছে। জেলা প্রশাসকও সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।’