ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে রাজনৈতিক উত্তাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে। সদ্য প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার এখন ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৮০ হাজার ২৫৮, মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯। এর আগের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৬০। এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯৭।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পর জমে উঠেছে প্রচার। চারটি সংসদীয় আসনের তিনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। বিএনপির ঘোষণার পর কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থী বদল চেয়ে বিক্ষোভ করেছে দলের একাংশ। অন্য দুটি আসনে বিরোধ নেই। তবে সব আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া জামায়াত।
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশির ভাগ সময় বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। জয়ী হয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই। আর এই সুযোগ নেওয়ার জোর চেষ্টা করছে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা বিএনপির বিরুদ্ধে এবার মাঠ দখলে সবচেয়ে বেশি তৎপর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি। কক্সবাজারের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে পুরনো ও আলোচিত নেতাদের প্রার্থী করেছে বিএনপি—সালাহউদ্দিন আহমেদ, লুৎফুর রহমান কাজল ও শাহজাহান চৌধুরী। অন্যদিকে নতুন মুখ নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত। কক্সবাজার-১ আসনে নবীন প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-২ আসনে কেন্দ্রীয় নেতা ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, কক্সবাজার-৩ আসনে শহিদুল ইসলাম বাহাদুর, কক্সবাজার-৪ আসনে জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী। তারা ইসলামী জোটের মাধ্যমে ভোটের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে।
কক্সবাজার-২ আসনটি বিএনপি এখনও ফাঁকা রেখেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা বা জোটগত সমঝোতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত হতে পারে। এখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—তারেক রহমান কি নিজেই প্রার্থী হবেন?
কক্সবাজারের চার আসনেই বিএনপির ঐতিহাসিক আধিপত্য থাকলেও এবার দু-একটি আসনে জামায়াতের আগ্রাসী প্রস্তুতি স্পষ্ট। সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, সেন্টমার্টিন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ অসংখ্য কৌশলগত কারণে সীমান্তবর্তী এই জেলার গুরুত্ব বেড়েছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য—এই চার আসনই।
কক্সবাজার-১ আসন ( চাকরিয়া-পেকুয়া ) :
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ২৯৪ নম্বর আসন কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলাকে নিয়ে গঠিত। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৫,৪০,৪৬৮, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,৯০,২৭৫ জন এবং মহিলা ভোটার ২,৫০,১৯২ জন।
এই আসনে নির্বাচনের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের এনামুল হক মঞ্জু, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনে বিএনপির সালাহ উদ্দিন আহমদ, ২০০১ সালে বিএনপির সালাহ উদ্দিন আহমদ, ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ ইলিয়াস, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাফর আলম এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিএনপি এই আসনে চারবার সংসদ দখল করেছে। এবারও বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, যিনি তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন, এবং তার স্ত্রী এডভোকেট হাসিনা আহমদ একবার এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে হাছিনা আহমেদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপিকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে হাছিনা আহমেদ পান ১,৫৬,৫১২ ভোট, আর সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ১,২১,১১১।
২০০১ সালের নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১,৩৪,৬০২ এবং পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপি পান ৭৪,২৯৭ ভোট। ১৯৯৬ সালের জুনে সালাহউদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হন ৭২,৫৯৪ ভোটে, এবং পরাজিত প্রার্থী পান ৫০,৮২৯ ভোট। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু নির্বাচিত হন ৩৭,৮৯৩ ভোটে, এবং পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম পান ৩২,৮৪৯ ভোট।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন জামায়াত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক। ফারুক ছাত্রজীবনে জেলা শিবিরের সভাপতি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমির। এটি তার প্রথম সংসদ নির্বাচনী প্রার্থীতা। ফলে অভিজ্ঞ বিএনপি নেতার সামনে নবীন জামায়াত প্রার্থী কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এ ছাড়াও এ আসনে এবি পার্টির অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান, জাতীয় পার্টির শামসুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মনির উল্লাহ, জাতীয় নাগরিক পার্টির মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, গণ অধিকার পরিষদের আব্দুল কাদের প্রাইম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সরওয়ার আলম প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চকরিয়া এলাকার নতুন ভোটার মহিমা ইসলাম বলেন, “চকরিয়া ও পেকুয়া মানুষ সালাহ উদ্দিন আহমেদ ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে গুরুত্ব দেয় না। কারণ এখানকার ভাগ্য বদলানোর মহাপুরুষ তিনি।”
কক্সবাজার-২ আসন ( মহেশখালী-কুতুবদিয়া ) :
কক্সবাজার-২, অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ২৯৫ নম্বর আসনটি কক্সবাজারের দুটি দ্বীপ—মহেশখালী ও কুতুবদিয়া—মিলিয়ে গঠিত। এবারের নির্বাচনে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৩,৮৭,৮৪০ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,০৬,৪৪৭ ও মহিলা ভোটার ১,৮১,৩৯৩ জন।
এই আসনটি এ বার বিএনপি ফাঁকা রেখেছে। দল এখনও কোনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মাঠে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে নিজ থেকেই বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কক্সবাজার-২ আসনে নির্বাচনের ইতিহাসে দেখা যায়,১৯৯১ সালে বাকশালের মোহাম্মদ ইসহাক বিএ নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনে বিএনপির এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী এবং আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের আশেক উল্লাহ রফিক নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে আবারও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এই আসনে রয়েছে মাতারবাড়ির গভীর সমুদ্র বন্দর, ধলঘাটা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, এসপিএম প্রকল্প, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া দ্বীপের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ দ্বীপ এবং বিশাল বঙ্গোপসাগর। তাই আন্তর্জাতিকভাবে এই এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর এবং ধলঘাটা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রভাবশালী দেশগুলোর নজরে রয়েছে। এখানকার সম্ভাব্য নীল-অর্থনীতি বিষয়ক সুযোগও বিশ্লেষকদের মতে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনী বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব কারণে বিএনপি এই আসন ফাঁকা রেখেছে। অন্যদিকে, জোটগত কারণে এটি শরিকদের দেওয়ার জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে এমন ধারণাও আছে। কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত এখানে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বা স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ আসনে উপস্থিত অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা এস এম সুজাউদ্দিন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হক। এরা সকলে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভোটের অতীত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে জামায়াত প্রার্থী ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ১,০৪,২৭১ ভোট পান এবং পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনসারুল করিম ৮৬,৯৪৪ ভোট পান। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ ১,০৩,৫০৩ ভোট পান এবং পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী ৪৯,১৯০ ভোট পান। ১৯৯৬ সালের জুনে বিএনপির প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ ৪৪,৪৪৫ ভোট পান এবং পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা ৩২,৪৪৩ ভোট পান। ১৯৯১ সালে আসনটি বাকশালের দখলে ছিল; নির্বাচিত প্রার্থী মোহাম্মদ ইসহাক বিএ ২৫,৭২৭ ভোট পান এবং পরাজিত জামায়াত প্রার্থী শফি উল্লাহ ২৩,৩৪৫ ভোট পান।
এই আসনে বিএনপি তিনবার বিজয়ী ও একবার জামায়াত বিজয়ী হলেও তা ছিল বিএনপির সঙ্গে জোটগত নির্বাচনে। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করেন, কক্সবাজার-২ আসনটি মূলত বিএনপির হিসাবেই পরিচিত।
কক্সবাজার-৩ আসন ( কক্সবাজার সদর-রামু-ঈদগাঁও ) :
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ২৯৬ নম্বর আসনটি কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত। এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৩৫ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯০ হাজার ৭৬৮ জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৬৭ জন।
এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৯১ সালে আসনটি জয় করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মোস্তাক আহমদ চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের এডভোকেট খালেকুজ্জামান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটি বিএনপির প্রকৌশলী মোঃ শহিদুজ্জামানের হাতে যায়। ২০০৮ সালে বিএনপির লুৎফুর রহমান কাজল আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। পরবর্তী নির্বাচনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাইমুম সরওয়ার কমল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে লুৎফুর রহমান কাজল ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৮ ভোট পান, যা আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার কমলের ৮৬ হাজার ৫৩৬ ভোটের তুলনায় অনেক বেশি। একই নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান ৬৩ হাজার ৬৮ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৯৫ ভোটে বিজয়ী হন, আর পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তাক আহমদ চৌধুরী পান মাত্র ৮ হাজার ৩১২ ভোট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান ৬৯ হাজার ১১৯ ভোটে জয়ী হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোস্তাক আহমদ চৌধুরী ৩২ হাজার ১০৬ ভোটে নির্বাচিত হন, আর পরাজিত বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান পেয়েছিলেন ৩১ হাজার ১০৯ ভোট। এইভাবে চারবার বিএনপির দখলে থাকা আসনে লুৎফুর রহমান কাজল দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় প্রার্থী হিসেবে পরিচিত।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন জামায়াতের শহিদুল ইসলাম বাহাদুর। তিনি একবার কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, তবে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে এটি তার প্রথম নির্বাচন। এক সময়ের ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে বাহাদুর কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তা এখনো আলোচনার বিষয়। উভয় প্রার্থী একে অপরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এই আসনের বিএনপি মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেন শহিদুল আলম বাহাদুর এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুহাদ্দিস আমিরুল ইসলাম। এছাড়া বেশ কয়েকটি দলও মনোনয়ন সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে।
নারী ভোটার নার্গিস আক্তার বলেন, “কক্সবাজারে অনেক উন্নয়ন প্রয়োজন। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ যারা করতে পারবে, আমরা সেরকম প্রার্থীকেই বিজয়ী দেখতে চাই।”
কক্সবাজার-৪ আসন ( উখিয়া-টেকনাফ ) :
কক্সবাজার-৪ আসনটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফ এবং বিশ্বের প্রধান শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্র উখিয়াকে নিয়ে গঠিত। এটি জাতীয় সংসদের ২৯৭ নম্বর আসন। এবারের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৭৫,৬১৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৯২,৭৬৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১,৮২,৮৩৯ জন।
আসনের ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের শাহজাহান চৌধুরী, ১৯৯৬ সালের জুনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, ২০০১ সালে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের শাহিন আক্তার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
শাহজাহান চৌধুরী চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ এবং কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে আব্দুর রহমান বদি ১,০৩,৬২৬ ভোট পেয়েছিলেন, আর শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছিলেন ৭৯,৩১০ ভোট। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেখানে শাহজাহান চৌধুরী ৮৯,৭৪৭ ভোট পান, আর মোহাম্মদ আলী পান ৪৮,৭৩৫ ভোট।
১৯৯৬ সালের জুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী ৪৪,৭০৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সেই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩০,৫৯৪ ভোট। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে শাহজাহান চৌধুরী ৩৬,৮৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, আর পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী পান ৩৩,১৭৬ ভোট।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী। তিনি জেলা কক্সবাজার জামায়াতের আমির এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চারবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। নুর আহমদ আনোয়ারী প্রথমবার সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে চষে বেড়াছেন। পাশাপাশি শাহজাহান চৌধুরীও জোরালো অবস্থান নিয়ে প্রচারণায় রয়েছেন।
দুই দলের নেতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকায় আসনটি নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই নিজেদের প্রার্থী হিসেবে এই আসনটি দাবি করছে। টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ফলে এই আসনটি নানাভাবে আলোচিত।
এছাড়া এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শামসুল হক শারেক, স্বতন্ত্র প্রার্থী পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি নুরুল বশর আজিজী, খেলাফত মজলিশের মাওলানা আফছার উদ্দিন চৌধুরী, এনসিপির উমর ফারুক, জাতীয় পার্টির তাহা ইয়াহিয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. হাবিবুর রহমানও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনে প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জয়ী হননি কেউ। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি।
সূত্র: বার্তাবাজার