1. admin@shimantoshohor.com : সীমান্ত শহর : - shohor
  2. shimantoshohor@gmail.com : সীমান্ত শহর : Shimanto Shohor
শিরোনামঃ

কক্সবাজার–৪ : দুই শীর্ষ নেতার সরাসরি লড়াই, নির্বাচনী মাঠে ‘হাইভোল্টেজ’ উত্তাপ

✍️ সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার

প্রকাশিত: ১১/১২/২০২৫ ১১:১৩ এএম

কক্সবাজার–৪ (উখিয়া–টেকনাফ) আসনকে ঘিরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ এখন তুঙ্গে। সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান, দেশের বৃহত্তম রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, মাদকব্যবসা, মানবপাচার ও চাঁদাবাজি—সব মিলিয়ে আসনটি বরাবরই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এ আসনে এবার সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপির জেলা সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির নূর আহমদ আনোয়ারী। ফলে নির্বাচনী মাঠে বিরাজ করছে ‘হাইভোল্টেজ’ পরিস্থিতি। স্থানীয়ভাবে দুই দলের সমর্থকেরা মাঠে ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, শাহজাহান চৌধুরী ও নূর আহমদ আনোয়ারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও মাঠের চালচিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচনী প্রচারণা যত তীব্র হচ্ছে, ততই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। ফলে কক্সবাজার–৪ আসনকে ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উখিয়া–টেকনাফের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থানের কারণে আসনটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “কক্সবাজার জেলার চারটি আসনেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে, নেতা–কর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। স্থানীয় মানুষ বিএনপির প্রতি আস্থাশীল, এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।”

অন্যদিকে জামায়াত এবার বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দলটির জেলা আমির অধ্যক্ষ নূর আহমদ আনোয়ারী টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চারবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব এবং সংগঠনভিত্তিক শক্তিশালী প্রস্তুতির কারণে দলটি আসনটি বিজয়ে আশাবাদী। নূর আহমদ আনোয়ারী জানিয়েছেন, জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও জবাবদিহির ব্যবস্থাই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি নির্বাচিত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।

উখিয়া–টেকনাফের এই সংবেদনশীল আসনে ১৯৭৯ সাল থেকে অর্থাৎ বিএনপি প্রতিষ্টাকালীন সময় থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। এবারও তিনি দলটির ঘোষিত প্রার্থী। তবে তার মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে সোচ্চার রয়েছেন জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বিএনপির আরেকটি অংশ। এছাড়াও শাহজাহান চৌধুরী এ আসনে সর্বোচ্চ চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৩৬,৮৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সে সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নৌকা প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৩৩,১৭৬ ভোট; ব্যবধান ছিল ৩,৬৯৬ ভোট। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শাহজাহান চৌধুরী আবারও বিজয়ী হন। তিনি পান ৮৯,৭৪৭ ভোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর রহমান বদি তালা–চাবি প্রতীকে পান ৪৮,৭৩৫ ভোট; ভোটের ব্যবধান ৪১,০১২। শাহজাহান চৌধুরী পরপর দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে আসনটি ধরে রাখেন। তবে পরিস্থিতি বদলে যায় একই বছরের জুন নির্বাচনে। বিপুল ভোট তিনি পরাজিত হন।

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নৌকা প্রতীকে পান ৪৪,৭০৬ ভোট এবং শাহজাহান চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পান ৩০,৫৯৪ ভোট; ব্যবধান ছিল ১৪,১১২ ভোট। তবে এই নির্বাচনে শাহজাহান চৌধুরীর আপন ছোট ভাই এড. শাহজালাল চৌধুরী দাড়ি পাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াত প্রার্থী হিসেবে বড় ভাই শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছিলেন। এতে বড়ভাই বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পান ৩০ হাজার ৫৯৪ ভোট, ছোট ভাই জামায়াত প্রার্থী এড. শাহজালাল চৌধুরী পান ১৭ হাজার ৬০৭ ভোট। দুই ভাই মিলে মোট ৪৮২০১ ভোট পেয়ে ছিলো, যা ছিলো বিজয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর চেয়ে ৩৪৯৫ ভোট বেশি।

২০০১ সালে শাহজাহান চৌধুরী আবারও বিজয়ী হন। তিনি পান ৮৯,৭৪৭ ভোট এবং আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী পান ৪৮,৭৩৫ ভোট; ব্যবধান ৪১,০১২ ভোট। ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের আবদুর রহমান বদি পান ১,০৩,৬২৬ ভোট এবং শাহজাহান চৌধুরী পান ৭৯,৩১০ ভোট; ব্যবধান ২৪,৩১৬ ভোট।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও আবদুর রহমান বদি নৌকা প্রতীক নিয়ে পান ১,০৫,৪৮৯ ভোট। জাতীয় পার্টির তাহা ইয়াহিয়া পান ৭,২৩৩ ভোট; ব্যবধান ছিল ৯৮,২৫৬ ভোট। বদি পরপর দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে আসনটি ধরে রাখেন। পরের বার মামলা জনিত জটিলতা কারনে তিনি নির্বাচন করতে পারেন নি। তার পরিবর্তে তার স্ত্রী নির্বাচন করেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের শাহীন আক্তার। তিনি পান ৯৬,৯৭৪ ভোট এবং বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী পান ৩৭,০১৮ ভোট; ব্যবধান ৫৯,৯৫৬ ভোট।

২০২৪ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে শাহীন আক্তার পান ১,২৫,৭২৫ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ঈগল প্রতীক নিয়ে নুরুল বশর পান ২৯,৯২৯ ভোট; ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ৯৫,৭৯৬ ভোট। শাহিন আক্তার পরপর দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে আসনটি ধরে রাখেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা ইস্যু, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা, মানবপাচার, চাঁদাবাজি এবং দখলবাজির ইস্যুগুলো ভোটারদের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের অবস্থান দুই দলের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী এ আসনে মোট ভোটার ৩,৬৮,০১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৮৮,৫৫৭ জন, নারী ভোটার ১,৭৯,৪৫৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন। উখিয়ায় ভোটার ১,৬৭,৯৪৬ জন এবং টেকনাফে ভোটার ২,০০,০৭০ জন। এ আসনে মোট ১০৭টি কেন্দ্র এবং ৭০৯টি বুথ রয়েছে; গণভোটের কারণে বুথ সংখ্যা আবার বাড়তে পারে।

বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শামসুল হক শারেক, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন, গবেষক ড. হাবিবুর রহমান, জাতীয় পার্টির তাহা ইয়াহিয়া, খেলাফত মজলিশের মাওলানা আফসার উদ্দিন চৌধুরী, এনসিপির মোহাম্মদ হোসাইন এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি নুরুল বশর আজিজী।

এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পালাবদলের অনন্য ইতিহাস রয়েছে।স্থানীয়ভাবে এ আসনটি ‘লক্ষ্মী আসন’ হিসেবে পরিচিত। জনমনে প্রচলিত বিশ্বাস—এ আসনে যে দল জয়ী হয়, সেই দলই জাতীয় ক্ষমতা পায়। রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা বিবেচনায়ও আসনটির গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ে অনন্য। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই উখিয়া–টেকনাফের নির্বাচনী মাঠ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে এলাকায় বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী কমিটি গঠন এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি চলছে; যা ভোটের দিন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন যদি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বচনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো কঠিন হয়ে যাবে বলে সচেতন মহলের ধারণা।

পোষ্টটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর
© 2025 Shimanto Shohor
Site Customized By NewsTech.Com