কক্সবাজার শহরের জানারঘোনা এলাকায় স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে হাত ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। শুরুতে স্বামী সাইফুল পরকীয়ার জেরে হত্যার কথা স্বীকার করলেও, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ইয়াবা কারবার ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই এই হত্যার মূল কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছে নিহত মুন্নির পরিবারের একটি সূত্র।
সূত্র জানায়, আয়ুব, সাইফুল এবং ইয়াছিন মিলে একটি ইয়াবা সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। সাইফুলের স্ত্রী মুন্নি এই অবৈধ ব্যবসার বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে পারিবারিক বিরোধ চরমে পৌঁছে। এ বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আয়ুব দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের মূল ডিলার হিসেবে কাজ করছিলেন। তার ছেলে এবং সাইফুল ইয়াবা পরিবহনের দায়িত্বে ছিলেন। ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনার সুবিধার্থে আয়ুব নিজ বাড়িতে সাইফুলকে থাকতে দেন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আয়ুব আত্মগোপনে রয়েছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুল প্রায়ই মাদকাসক্ত অবস্থায় স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন। বিভিন্ন সময় মুন্নি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং এ বিষয়ে পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে অভিযোগও করেছিলেন। এমনকি তিনি কয়েকবার প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও জানা গেছে।
পরিবারের একটি সূত্র জানায়, মুন্নি দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর নির্যাতন সহ্য করছিলেন। পরে তিনি ইয়াবা কারবারের বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর হুমকি দিলে সাইফুল ও তার সহযোগীরা মিলে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা যায়, আয়ুব ইয়াবা ব্যবসার অর্থ দিয়ে জানারঘোনা এলাকায় একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রথমে সেখানে এক সাংবাদিক ভাড়ায় থাকলেও পরে তাকে সরিয়ে দিয়ে সাইফুলকে রাখা হয়। স্থানীয়দের মতে, ওই বাড়ি থেকেই নিয়মিত ইয়াবা পাচার হতো। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের যাতায়াত ছিল সেখানে। আয়ুব মাঝে মধ্যে এলেও মুখ ঢেকে চলাফেরা করতেন। তার ছেলে ইয়াছিন ও সাইফুল ইয়াবা পাচারে সক্রিয় ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, আয়ুব একজন রোহিঙ্গা, যার পরিবার ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে তার আত্মীয়রা কুতুপালং এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে নিজের পরিচয় গোপন করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আয়ুব বর্তমানে কলঘর এলাকায় তার নতুন বাড়িতে আত্মগোপনে রয়েছেন, যদিও তার পরিবার দাবি করছে তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন।
পুলিশ জানায়, হত্যাকান্ডের পর আয়ুবের ছেলে ইয়াছিনকে থানায় আসার জন্য বার বার যোগাযোগ করা হলেও সে থানায় আসতে গড়িমসি করে। পরে সাইফুল গ্রেফতার হওয়ার পর অনেকটা বাধ্য হয়ে থানায় আসে।
এলাকাবাসীর মতে, আয়ুবের সক্রিয়তায় এলাকায় আবারও ইয়াবা কারবার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তাদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড শুধু পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এর পেছনে একটি সংগঠিত মাদক চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সাবেক এক ভাড়াটিয়া সাংবাদিক জানান, শুরুতে আয়ুবের ইয়াবা কারবার সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন, বাড়িটি “ইয়াবা দালান” নামে পরিচিত। হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ মাস আগে তাকে বাসা ছাড়তে বলা হয়। এর কিছুদিন পরই সেখানে আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, আয়ুব সহযোগী শামশুল আলমকে নিয়ে ভবনটি নির্মাণ করেন এবং পরে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আয়ুব ও তার ছেলে ইয়াছিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাড়ির মালিক আয়ুবের ছেলে ইয়াছিন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজীব পাল বলেন, আসামি একবার জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রয়োজনে তাকে আবার রিমান্ডে এনে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে।
সূত্র: উখিয়া নিউজ