দেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস ব্লক-১৮-এর অবস্থান মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা এলাকায়। এ গ্যাস ব্লকে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য মিলছে গবেষণায়।
পূর্বাঞ্চলীয় ফোল্ডবেল্ট ব্লক-১৮-এর আওতাধীন সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ ও কোরাল দ্বীপে প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য প্রায় ৬ হাজার ১৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) বা ছয় টিসিএফ গ্যাস সম্পদ রয়েছে বলে গবেষণায় জানা গেছে।
পূর্বাঞ্চলীয় ফোল্ডবেল্টে বিপুল গ্যাস সম্ভাবনার বিষয়টি দেড় দশক আগেও ইঙ্গিত দিয়েছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেশের সমুদ্রসীমার গভীরে গ্যাসের সম্ভাবনার নানা প্রক্ষেপণ থাকলেও এসব এলাকায় বৃহৎ আকারে অনুসন্ধানের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি পেট্রোবাংলা কিংবা জ্বালানি বিভাগ। বরং গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
দেশের গভীর ও অগভীর সাগরে মোট ২৬টি গ্যাস ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় ব্লক-৮ থেকে ব্লক-১৮ পর্যন্ত এলাকা প্রবল সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত। সাগরে বিদেশি বেশ কয়েকটি কোম্পানি ইজারা নিলেও পরবর্তী সময়ে নানা কারণে তারা ব্লক ছেড়ে চলে যায়।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান ব্লক-১৮-তে গ্যাস সম্ভাবনার যে তথ্য দিয়েছিল, সেসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাড়তি সম্ভাবনার তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। এমনকি গ্যাস আমদানির বিপরীতে স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ করে বিপুল গ্যাস পাওয়ার পূর্বাভাসও ছিল। কিন্তু সেসব প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বিনিয়োগ না করে সিদ্ধান্তহীনতা ও বিদেশি কোম্পানির অপেক্ষায় সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অফশোর এলাকায় গ্যাস সম্ভাবনার নানা তথ্যের বিষয়টি অস্বীকার করেননি পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা। তবে তাদের ভাষ্য, গভীর সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে অতীতের বিভিন্ন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা, বিনিয়োগে অনাগ্রহ, দক্ষ লোকবলের অভাব এবং বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত সংকট ছিল। এ কারণে গ্যাস উৎপাদন কমলেও স্থানীয়ভাবে বৃহৎ আকারে এসব পূর্বাভাস মূল্যায়িত হয়নি।
দেশের অফশোর অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। সরকারের অনুমতি পেলে আগামী মাসে এ দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, “সাগরে দরপত্র আহ্বানে পেট্রোবাংলা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে যাব।”
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও কোরাল দ্বীপ অঞ্চলে ছয় টিসিএফের বেশি সম্ভাব্য প্রাথমিক গ্যাস সম্পদের উপস্থিতি রয়েছে। যেখান থেকে উত্তোলনযোগ্য সম্ভাব্যতা ৪ হাজার ৭৪৫ বিসিএফ এবং প্রমাণিত সম্ভাব্যতা ২ হাজার ৬৪ বিসিএফ।
বেইজিংভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কেইএআই ব্লক-১৮-তে গ্যাস সম্ভাবনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণা প্রতিবেদনে ‘মন্টে কার্লো সিমুলেশন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে অফশোরের গ্যাস ব্লক-১৮-এর প্রাথমিক সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
‘অ্যাসেসমেন্ট অব প্রসপেক্টিভ গ্যাস রিসোর্সেস অ্যান্ড ডেভেলপ আ প্রডাকশন ভিউ অব ইস্টার্ন ফোল্ডবেল্ট (ব্লক-১৮), বাংলাদেশ ইউজিং মন্টে কার্লো সিমুলেশন মেথড’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে মূলত টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও কোরাল দ্বীপ এলাকায় গ্যাস সম্ভাবনা, নিরূপণ ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনচিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মন্টে কার্লো সিমুলেশন একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যেখানে অনিশ্চিত বা জটিল সমস্যার সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান করতে বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, টেকনাফে ভূগর্ভস্থ স্ট্রাকচারে প্রাথমিক গ্যাসের সম্ভাব্য উপস্থিতি ৮৪৪ দশমিক ৩৫ বিসিএফ, কোরাল দ্বীপে ৩ হাজার ৫০৮ দশমিক ৭২ বিসিএফ এবং সেন্ট মার্টিনে ১ হাজার ৭৯২ দশমিক ৯১ বিসিএফ। এ তিন স্ট্রাকচার থেকে উত্তোলনযোগ্য সম্ভাব্যতা ৪ হাজার ৭৪৫ বিসিএফ।
২০১১ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস যে রিসোর্স রিজার্ভ অনুমান করেছিল, তা ছিল ৪ হাজার ৪৭৩ বিসিএফ। বর্তমান গবেষণায় মন্টে কার্লো সিমুলেশন ব্যবহার করে অনুমান বেড়ে ৪ হাজার ৭৪৫ বিসিএফে উন্নীত হয়েছে।
ইস্টার্ন ফোল্ডবেল্ট এলাকায় গ্যাসের প্রমাণিত সম্ভাব্যতা ২ হাজার ৬৪ বিসিএফ বা দুই টিসিএফের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের অফশোর এলাকায় দেড় দশক ধরে অনুসন্ধান স্থবির হয়ে রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, “দেশে ফোল্ডবেল্ট অঞ্চলে সবসময় গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় এলাকা টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, ইনানী। সরকারের উচিত দ্রুত দরপত্রের মাধ্যমে এসব এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করা।”
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, “অফশোর অঞ্চলে বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ ও কোরাল দ্বীপ এলাকায় গ্যাসের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন তথ্যে পাওয়া গেছে। সম্ভাবনা অনেক। তবে অনুসন্ধান ছাড়া সঠিক পরিমাণ বলা কঠিন।”
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এরপর গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লকে বঙ্গোপসাগরকে ভাগ করা হয়।
কনোকোফিলিপস, ওএনজিসি ভিদেশ, স্যান্তোস, ক্রিস এনার্জি ও পস্কো দাইয়ুসহ বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে কাজ নিলেও শেষ পর্যন্ত কেউ টেকসইভাবে অনুসন্ধান চালায়নি।
এরপর দেশের সমুদ্রসীমায় বড় কোনো বিদেশি কোম্পানি কাজ করেনি। ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো বিদেশি কোম্পানি শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝোঁক বেশি থাকায় সমুদ্র অনুসন্ধান পিছিয়ে পড়ে। অথচ সমুদ্রে জরিপে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা উঠে এসেছিল।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এক্সনমবিল। দরপত্র ছাড়াই চুক্তির প্রস্তাব দিলেও তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি।
সূত্র: বণিক বার্তা।