কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট আউটলেটে জমা রাখা টাকা ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা। প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে অনেকেই সাদা কাফনের কাপড় পরে কর্মসূচিতে অংশ নেন।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে পালংখালী স্টেশন চত্বরে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে টাকা তুলতে গিয়ে নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হয়েছেন। পরে হিসাব যাচাই করে দেখেন, তাঁদের জমা করা অর্থের বড় অংশ হিসাবে নেই। দ্রুত জমাকৃত অর্থ ফেরত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পালংখালী বাজারে অবস্থিত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮) ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া থানা-পুলিশ। পরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়।
মামলার বাদী ও আউটলেটের গ্রাহক আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বলেন, তাঁর নিজের হিসাবে ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, হিসাবে সেই অর্থ নেই। একই ধরনের অভিযোগ আরও অনেক গ্রাহকের রয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিয়ে গ্রাহক আমিরুল ফয়েজ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ওই আউটলেটে টাকা জমা করেছি। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে হিসাব মিলিয়ে দেখি, জমা করা টাকার সঙ্গে হিসাবে থাকা অর্থের মিল নেই। আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দ্রুত ফেরত চাই।
গ্রাহক মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, আমি বিশ্বাস করে ওই আউটলেটে ৬ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু হিসাব যাচাই করে দেখি, আমার অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৮০ টাকা। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দ্রুত ফেরত চাই।
আরেক গ্রাহক আবুল মঞ্জুর বলেন, আমার অ্যাকাউন্টে ৪ লাখ টাকা জমা ছিল। এখন হিসাবে দেখানো হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকা। এটি আমাদের সঙ্গে চরম প্রতারণা। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জমা করা সব টাকা ফেরত চাই।
ভুক্তভোগী আব্দুল কাদের বলেন, “আমার অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জমা ছিল। অথচ এখন হিসাবে রয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা। জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। দ্রুত আমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
গ্রাহক কুলসুম নাহার বলেন, “বিশ্বাস করে টাকা জমা রেখেছিলাম। এখন প্রয়োজনের সময় জানতে পারছি, হিসাবে পুরো টাকা নেই। সঠিক হিসাব যাচাই করে প্রত্যেক গ্রাহকের জমা করা টাকা ফেরত দিতে হবে।
আরেক গ্রাহক নুরুল বশর বলেন, “আমি সাড়ে ৭ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, হিসাবে রয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। আমাদের মতো আরও অনেকের টাকাও আটকে আছে। আমরা টাকা ফেরত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পালংখালী বাজারের ইয়াকুব-মোস্তফা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটটির কার্যক্রম শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের কারণে অনেক গ্রাহক সেখানে হিসাব খুলে নিয়মিত লেনদেন করতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আউটলেটটির মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পরস্পরের যোগসাজশে হিসাবের বই, জমার রসিদ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ অন্য হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন। কোনো কোনো হিসাবে লাখ লাখ টাকা জমা থাকলেও পরে মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, গত ১৮ আগস্ট গ্রাহকেরা তাঁদের জমা রাখা ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা ফেরত চাইতে গেলে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে আটক করেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের হেফাজতে নেয়।
এ ঘটনায় আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন, ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম, ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ, অংশীদার মালিক বেলাল উদ্দিনসহ মোট নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আউটলেটটির ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সূত্র: উখিয়া নিউজ