কক্সবাজারের টেকনাফের কচ্ছপিয়া ও করাচিপাড়া উপকূলে মানবপাচার যেন এক বেপরোয়া ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কড়াকড়ি, র্যাব, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের টানা অভিযান—কিছুই থামাতে পারছে না দালালচক্রের নৃশংস এই কারবার। পাহাড়ি দুর্গম আস্তানা ও বঙ্গোপসাগরের সাগরপথ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এমন এক গোপন ট্রানজিট রুট, যেখানে মানুষকে মাছের মতো বিক্রি করা হয়, বন্দি রাখা হয় গবাদিপশুর মতো। রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের গর্জন, জিম্মিদের কান্না আর দালালদের অবাধ তৎপরতায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় অসংখ্য মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচারের প্রস্তুতি চলে নির্দ্বিধায়।
২১ অক্টোবর ভোরে টেকনাফের করাচিপাড়ায় ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে পাহাড়ি একটি ডেরা গুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বন্দিদশা থেকে ছয়জন জিম্মিকে উদ্ধার ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় মোহাম্মদ হোছনের পুত্র মো. রুবেলকে। পরে রুবেল এবং উদ্ধার ভিকটিমদের তথ্যের ভিত্তিতে আরও আটজনকে শনাক্ত করে মামলা দায়ের হয়। তবে বিজিবির দাবি, মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় পুরো চক্র ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টেকনাফের কচ্ছপিয়া, করাচিপাড়া ও আশপাশের গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মানবপাচার সিন্ডিকেটে সরাসরি জড়িত। তাদের মধ্যে আছেন—জসিম উদ্দিন ওরফে জসিম সওদাগর, আব্দুর রকিম, আব্দুল গফুর (স্থানীয় মেম্বার খালেদা বেগমের স্বামী), রিদুয়ান, দিলদার মিয়া, বুজরুজ মিয়া, মো. রফিক, মোহাম্মদ রফিক, কেফায়ত উল্লাহ, আয়াত উল্লাহ, আব্দুল্লাহ, আলী আজম, ছৈয়দ নুর, আব্দুল করিম, মোজাম্মেল, হুমায়ুন, শহিদ, আব্দুল মতলব, আব্দুল মাবুদ, মুজিব উল্লাহ, হেলাল উদ্দিন, বেলাল উদ্দিন, জয়নাল, হামিদ উল্লাহ, শাহজাহান, রশিদ মিয়া, ওমর আকবর, আলী আকবর, ছেবর মিয়া, ছৈয়দুল হক, নুরুল আমিন, মো. সোহেল, মো. ইলিয়াছ, জাহিদুল ইসলাম হৃদয়, আনোয়ারুল ইসলাম, মো. ইউনুছ, মো. তৈয়ব, রাসেল প্রমুখ।
তাদের বেশিরভাগই পূর্বে মানবপাচারের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন, কিন্তু বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন।
অভিযানরত সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি আস্তানাগুলোতে নারী ও শিশুদের প্রথমে আটক রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে ট্রলারযোগে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। চক্রের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, রোহিঙ্গা পরিবারের অনুরোধ ও অর্থের বিনিময়ে এই পাচার বেশি ঘটে। কাউকে নাকি জোর করে পাঠানো হয় না, বরং অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে তাদের মালয়েশিয়ার পথে পাঠানো হয়।
এর আগে গত ১৮ ও ২১ সেপ্টেম্বর বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং র্যাবের যৌথ অভিযানে কচ্ছপিয়ার পাহাড়ে নারী ও শিশুসহ প্রায় দেড়শ জিম্মিকে উদ্ধার করা হয় এবং তিন পাচারকারীকে আটক করা হয়। পরে ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর কোস্টগার্ড পৃথক অভিযানে আরও পাঁচজন ভিকটিম উদ্ধার এবং দুই অপহরণকারীকে আটক করে। তবুও পাচার থামেনি, বরং পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন ও নতুন কৌশলে ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি আবু জায়েদ মুহাম্মদ নাজমুন নুর বলেন, মানবপাচারে জড়িত যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। র্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (ল’ এন্ড মিডিয়া অফিসার) সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক বলেন,অপহরণ ও পাচারকারীরা সীমান্ত অতিক্রমের নতুন রুট ব্যবহার করছে। র্যাব সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে মানবপাচার রোধে অভিযান চালাচ্ছে। জিম্মিদের নিরাপদে উদ্ধার করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সিয়াম-উল-হক বলেন, “কচ্ছপিয়া ও করাচিপাড়া সীমান্ত এলাকা মানবপাচারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো মানবপাচারকারী আইনের আওতার বাইরে থাকবে না এবং প্রতিটি অভিযান যথাযথভাবে চালিয়ে যাচ্ছি যাতে এই ভয়াবহ অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়।
২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, পাহাড়ি ডেরা ধ্বংস ও জিম্মি উদ্ধার করা হয়েছে, এবং বিজিবি মানবপাচার ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল।
স্থানীয় সচেতন মহলের মত—যতদিন না কচ্ছপিয়া উপকূলে সক্রিয় অর্ধশতাধিক দালাল ও তাদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনগত জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে, ততদিন এ সীমান্তে মানবপাচারের এই ভয়াবহ দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না।