১৯৭৯ সালে সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদের শাসনামলে কাবা শরিফের নতুন দরজা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন থাইল্যান্ডের নাগরিক আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুতালিব। ওই সময় তিনি থাইল্যান্ডের ছয়জন কারিগর- তিনজন কাঠমিস্ত্রি ও তিনজন স্বর্ণকারকে নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে দরজা নির্মাণের কাজে অংশ নেন।
সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে ৭৮ বছর বয়সী আবদুল্লাহ বর্তমানে সৌদি আরব সফর করছেন। সফরকালে মদিনায় স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি ১৯৭৯ সালের সেই স্মৃতি তুলে ধরেন।
আবদুল্লাহ জানান, ১৯৭৩ সালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরে উসুলুদ্দিন বা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের ওপর উচ্চতর শিক্ষা নেন। ওই সময় থাইল্যান্ডে আরবি ভাষায় দক্ষ অনুবাদক হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।
একদিন প্রিন্স মাজিদের সচিব আবদুল্লাহ আল-তুর্কি তাকে জানান, দুই সৌদি নাগরিক লিফট থেকে বের হচ্ছেন এবং তাদের অভ্যর্থনা জানাতে হবে।
তারা ছিলেন মক্কার প্রধান স্বর্ণকার শায়খ আহমদ ইবরাহিম বদর এবং তার আত্মীয় হাসান হারিরি। শায়খ আহমদ তাকে জানান, থাইল্যান্ড থেকে পাঠানো কাঠ মক্কায় পৌঁছেছে। এরপর তিনজন কাঠমিস্ত্রি ও তিনজন স্বর্ণকারকে নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে কাজটির নেতৃত্ব ও অনুবাদের দায়িত্ব নিতে আবদুল্লাহকে বলা হয়।
আবদুল্লাহর ভাষায়, কাবার দরজা নির্মাণের সেই কাজ ছিল তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অভিজ্ঞতা।
ছয় কারিগরকে নিয়ে আবদুল্লাহ সৌদি আরবে যান। দরজাটির নকশা করেছিলেন সিরিয়ার নাগরিক মুনির আল-জুন্দি।
নতুন দরজা তৈরির আগে আবদুল্লাহ ও আল-জুন্দি প্রথমবারের মতো কাবা শরিফের ভেতরে প্রবেশ করে দরজার প্রয়োজনীয় মাপ নেন। এর আগে কাবার যে দরজাটি ছিল, সেটি বাদশাহ আবদুল আজিজের আমলে নির্মিত হয়েছিল।
মাপ নেওয়ার পর তারা শায়খ আহমদ ইবরাহিম বদরের বাড়িতে যান। সেখানে একটি ছোট কর্মশালা ছিল। প্রথমে সেখানে কাঠ দিয়ে দরজার কাঠামো তৈরি করা হয়।
কাঠের কাজ শেষ হওয়ার পর দরজাটি নির্ধারিত স্থানে বসানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয় এবং পরে তাতে প্রায় ২৮০ কেজি সোনার প্রলেপ দেওয়া হয় বলে আবদুল্লাহ জানান।
দরজাটির কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফির কাজ করেছিলেন শায়খ আবদুর রহিম আমিন মক্কি। এর আগের দরজাতেও তিনি কোরআনের আয়াত লিখেছিলেন। বাদশাহ খালিদ নতুন দরজাতেও তার হাতের ক্যালিগ্রাফি চেয়েছিলেন।
তখন শায়খ আবদুর রহিমের বয়স ছিল প্রায় ৮৫ বছর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হতো। এরপরও তিনি ধীরে ধীরে দরজার ক্যালিগ্রাফির কাজ সম্পন্ন করেন।
আবদুল্লাহ দরজাটির নকশার বিভিন্ন অংশের কথাও তুলে ধরেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, দরজাটিতে আল্লাহর ১৫টি সুন্দর নাম (আসমাউল হুসনা) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে ছয়টি এক পাশে, ছয়টি অন্য পাশে এবং বাকি তিনটি দরজার ওপরের অংশে রয়েছে।
আবদুল্লাহ জানান, পুরো কাজ শেষ করতে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় লেগেছিল। এ সময় মসজিদে হারামে নিচে আগতরা তাওয়াফ করছিলেন, আর ওপরের অংশে কারিগররা দরজা নির্মাণ ও স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
কাজ শেষ হওয়ার পর্যায়ে পুরোনো দরজাটি খুলে ফেলা হয় এবং নতুন দরজাটি সেখানে স্থাপন করা হয়।
আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন দরজাটি ২২ জিলকদ ১৩৯৯ হিজরি, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কাবা শরিফে স্থাপন করা হয়।
১৯৭৯ সালের এই দরজা নির্মাণের কাজে থাইল্যান্ডের কারিগরদের অংশগ্রহণ এবং আবদুল্লাহর অনুবাদক ও সমন্বয়কের ভূমিকা তাকে কাবা শরিফের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষীতে পরিণত করেছে।
প্রায় পাঁচ দশক পর সৌদি আরব সফরে এসে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে কাবা শরিফের দরজা নির্মাণের মাপজোক, কাঠের কাঠামো তৈরি, সোনার প্রলেপ, কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি এবং শেষ পর্যন্ত দরজাটি স্থাপনের নানা ঘটনা।