চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, আকবর শাহ ও খুলশী-নগরের এই তিন থানা এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অস্ত্রবাজির অভিযোগে আলোচিত ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। পুলিশের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে রয়েছে ১৭টি মামলা।
এবার তার বিরুদ্ধে সরাসরি পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। অতীতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নতুনভাবে এই সন্ত্রাসীর গায়ে তকমা লেগেছে ‘বিএনপি’। ক্ষমতার পরশে ছুঁয়েছে ‘মেয়র’ আর্শীবাদ! ফলে এখন আর পুলিশকেও তোয়াক্কা করছে না এই সন্ত্রাসী। মামলায় নেওয়ায় ওসিকে শুধু হুমকি দিয়ে ক্লান্ত হয়নি, ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছে- পুলিশের ওপর হামলা করে।
শুক্রবার ভোরে খুলশী ওয়্যারলেস মোড় ও পাহাড়তলী এলাকায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশ সদস্যদের আটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি গাড়ি। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়ারও অভিযোগ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় খুলশী থানার ওসিসহ অন্তত আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ওয়াকিল হোসেন এলাকায় ‘বগা’ নামে পরিচিত। তিনি নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। সরকারি জায়গার দখল নিয়ে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর গত ৮ জুন তাঁকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
মামলা ১৭টি, এবার পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ
খুলশী থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ আগস্ট পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং কলেজের অধ্যক্ষকে ভিডিও কলে রেখে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় ওয়াকিলকে করা হয়েছে দুই নম্বর আসামি। মামলায় তাঁর ছয় সহযোগীকেও আসামি করা হয়েছে।
এই মামলার পর পুলিশ ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের মুঠোফোনে কল করেন ওয়াকিল। তাঁর বিরুদ্ধে কেন মামলা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান তিনি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় ওসিকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান ওসি। পরে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। এরপরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা
পুলিশের ভাষ্য, অভিযানের খবর পেয়ে রাতে ওয়াকিল তাঁর অনুসারীদের জড়ো করতে থাকেন। শুক্রবার ভোর চারটার দিকে পুলিশ তাঁকে ধরতে ওয়্যারলেস এলাকায় পৌঁছালে তাঁর অনুসারীরা বিএনপির নামে স্লোগান দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেন।
ব্যারিকেডের কারণে পুলিশ সদস্যরা আটকে পড়েন। এরপর তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়। এতে ওসিসহ আট পুলিশ সদস্য আহত হন। হামলাকারীরা ওসির সরকারি গাড়িও ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর ককটেল ছোড়া হলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ওয়্যারলেস এলাকার বিভিন্ন গলি এবং ওয়াকিলের বাসভবনে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। তবে ততক্ষণে সেখান থেকে পালিয়ে যান ওয়াকিল।
খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম বলেন, কলেজশিক্ষককে পেটানোর ঘটনায় মামলা নেওয়ায় মুঠোফোনে তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন ওয়াকিল। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় আদালতের পরোয়ানাও ছিল। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ওসি জানান, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াকিল হোসেনসহ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চাঁদাবাজি, মাদক, বিস্ফোরক-১৭ মামলার আসামি
পুলিশের তালিকায় ওয়াকিল হোসেন একজন সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৭টি মামলা রয়েছে। পাহাড়তলী, আকবর শাহ ও খুলশী থানা এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওয়াকিলের বাহিনীর চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অস্ত্রবাজিতে তাঁরা অতিষ্ঠ।
সরকারি জায়গার দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর কলেজশিক্ষককে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও অধ্যক্ষকে হুমকির মামলায় তিনি ফের আসামি হয়েছেন। এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় আদালতের পরোয়ানাও রয়েছে।
আর এবার গ্রেপ্তার করতে যাওয়া পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে ১৭ মামলার আসামি একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশই যখন হামলার শিকার হয়, তখন নগরের অপরাধ পরিস্থিতিতে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার প্রভাব ও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
ওসিকে হুমকি ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওয়াকিল হোসেনের দুটি মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সূত্র: পতকানিউজ