সংসদীয় আসন ২৯৭ কক্সবাজার–৪ (উখিয়া–টেকনাফ) দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত একটি ‘ভাগ্যবান আসন’ হিসেবে। ইতিহাস বলছে, এই আসন থেকে যে দল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে, পরবর্তীতে সেই দলই সরকার গঠন করেছে, এমন নজির দেশের রাজনীতিতে বিরল। ১৯৮৬ সালে উখিয়া–টেকনাফ নিয়ে এই আসন গঠিত হয়। এর আগে রামু, উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে এটি ছিল চট্টগ্রাম–১৮ আসন।
জেলা নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৭৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩ হাজার ৬৯৮ এবং মহিলা ৯৯ হাজার ৮০ জন। এখানে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৬১টি।
উখিয়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৭ জন—পুরুষ ৮৯ হাজার ১০৮ ও মহিলা ৮৩ হাজার ৮৬৯ জন। ভোট কেন্দ্র ৫৪টি।
সব মিলিয়ে উখিয়া–টেকনাফের ১১টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৫৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯২ হাজার ৮০৬ এবং মহিলা ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৫২ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১১৫টি।
এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৯১ সালে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী ৩৬,৮৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন; সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে আবারও তিনি জয়ী হন। ১৯৯৬ (জুন) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী বিজয়ী হন; সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী ৮৯,৭৪৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন; সরকার গঠন করে বিএনপি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি বিপুল ভোটে জয়ী হন; সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বদির স্ত্রী শাহিনা আক্তার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে চারজন প্রার্থী সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমেদ আনোয়ারী (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা নুরুল হক (হাতপাখা), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) প্রার্থী সাইফুদ্দিন খালেদ (সিংহ)। প্রার্থীদের প্রচারণায় উখিয়া–টেকনাফজুড়ে নির্বাচনি আমেজ এখন স্পষ্ট।
উখিয়ার রত্নাপালং, রাজাপালং, হলদিয়াপালং, জালিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের শতাধিক মহিলা ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার পর এবার তারা নতুন রাজনৈতিক বিকল্প দেখতে চান। সাংবাদিকদের চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মহিলা ভোটার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পুরুষ ভোটারদের প্রায় ৬৫ শতাংশ ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে মত দিয়েছেন।
চারজন প্রার্থী থাকলেও মাঠের বাস্তবতায় মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে জামায়াত ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভোটারদের বড় একটি অংশ ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র, সীমান্ত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মাদক নির্মূল ও রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর সমাধান চান।
রাজাপালং ইউনিয়নের ভোটার আবদুল মজিদ বলেন, “সৎ ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি চাই। নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান আমাদের বড় সমস্যা।”
টেকনাফ পৌরসভার ভোটার রাশেদুল ইসলাম বলেন, “প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা বাস্তব ফল দেখতে চাই।”
হোয়াইক্যং এলাকার তরুণ ভোটার হুমায়ুন আজাদ আকাশ বলেন, “মাদকবিরোধী কার্যকর উদ্যোগ ও তরুণদের কর্মসংস্থান জরুরি।”
অন্যদিকে ভোটার কমরুদ্দিন বলেন, “ইয়াবামুক্ত উখিয়া–টেকনাফ ও রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।”
এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তুতি নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।