স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে উচ্ছেদের আড়াই মাস না পেরোতেই আবারও দখল হয়ে গেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও আশপাশের বালিয়াড়ি। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিকে কেন্দ্র করে রাতের অন্ধকারে বালিয়াড়ি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে চার শতাধিক অবৈধ দোকান ও রেস্তোরাঁ। একই সঙ্গে ঝাউবাগান ও সৈকতের আরও বিভিন্ন অংশ দখল করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে।
গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশনার পর ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯৩০টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে।
পরে সৈকত পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, উচ্ছেদ করা বালিয়াড়িতে যাতে আর কোনো দোকান বা স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উচ্ছেদ হওয়া সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ির প্রায় পুরো এলাকাজুড়েই আবার দোকানপাট বসানো হয়েছে। শামুক-ঝিনুকের তৈরি পণ্য, কাপড়, রোদচশমা, আচার, প্রসাধনসামগ্রী, চা-কফি, ভাজা মাছসহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে। অধিকাংশ দোকান ভ্যানগাড়ির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং নিচে চাকা সংযুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রশাসনের অভিযান শুরু হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঈদের আগের রাত থেকেই দোকান বসানোর কাজ শুরু হয়। গত কয়েক দিনে সুগন্ধা, কলাতলী ও সিগাল পয়েন্ট এলাকায় চার শতাধিক দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব দোকানে বেচাকেনা চলছে।
সোমবার দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ১২ মার্চ যেসব স্থান থেকে দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল, ঠিক সেসব স্থানেই নতুন করে দোকান বসানো হয়েছে। অনেক দোকানে কোনো সাইনবোর্ড নেই। দোকানমালিকদের পরিচয় সম্পর্কেও তথ্য দিতে অনীহা দেখা গেছে।
একটি দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম জানান, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করার পর দোকানমালিকেরা আবারও ব্যবসা শুরু করেছেন। তাঁর দাবি, উচ্ছেদের আগে প্রায় ১০ বছর ধরে ওই স্থানে দোকান পরিচালিত হচ্ছিল।
১৯৯৯ সালে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। আইন অনুযায়ী জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে বালিয়াড়িতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। এ ছাড়া বালিয়াড়িতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতেরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে একটি চক্র আবারও সৈকত দখলের বাণিজ্যে নেমেছে। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘সেভ দ্য কক্সবাজার’-এর সভাপতি তৌহিদ বেলাল বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর একটি প্রভাবশালী চক্র বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে যেমন পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে আবারও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রশাসনের নীরবতায় অন্যরাও বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখলে উৎসাহিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন। আদালত প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। সৈকতে নামার প্রবেশমুখে ঝুপড়ি দোকানের সারি পর্যটকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। উচ্ছেদ অভিযানের পর সৈকতে যে উন্মুক্ত পরিবেশ ফিরে এসেছিল, নতুন করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় তা আবারও নষ্ট হচ্ছে। ফলে সন্ধ্যা ও রাতের সময় অনেক পর্যটক সৈকতে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনের আগের উচ্ছেদ অভিযানের পরও কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যে শত শত অবৈধ দোকান গড়ে উঠল, সেই প্রশ্ন এখন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সূত্র: টিটিএন