1. admin@shimantoshohor.com : সীমান্ত শহর : - shohor
  2. shimantoshohor@gmail.com : সীমান্ত শহর : Shimanto Shohor
শিরোনামঃ
ঢাকার বিদ্যুৎ যাবে গ্রামে, ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর উখিয়ায় একাধিক মামলার পলাতক আসামি টিটু পুলিশের জালে সাধারণ মানুষের কষ্টের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে সংসদকেও এই লোডশেডিংয়ের আওতায় রাখা উচিত ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ওসমান হাদির জবানবন্দি গ্রহণ করলেন ট্রাইব্যুনাল উখিয়ায় অবৈধভাবে পাহাড় কর্তন ও বালু উত্তোলন: ৩ লাখ টাকা জরিমানা ইয়াবা নিতে ওবায়দুল কাদের প্রতিমাসে কক্সবাজার আসতেন’ ফ‍্যাসিস্ট আমলের সব সার ডিলার বাতিল টেকনাফের হ্নীলায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পল্লীতে এমপি শাহজাহান চৌধুরীর সহায়তা কক্সবাজারে পর্যাপ্ত বিমান শক্তি থাকলে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি হত না: সেনাপ্রধান টেকনাফে দুই সাজাপ্রাপ্ত পলাতক গ্রেপ্তার

আরাকান আর্মির হাতে নিখোঁজ শতাধিক জেলে

✍️ সীমান্ত শহর

প্রকাশিত: ১৪/১০/২০২৫ ১২:০০ পিএম

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নাফ নদ—দুই দেশের প্রাকৃতিক সীমারেখা। একসময় এ নদ ছিল জীবিকার প্রতীক, জেলেদের হাসিমুখে ভরপুর। কিন্তু আজ সেই নাফ নদই হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ, অনিশ্চয়তার জলরাশি।

 

মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আগ্রাসনে নদীর দুই তীরে এখন ভাসছে কান্না, শোক আর প্রতীক্ষার ভারী নিস্তব্ধতা। সীমান্তের এই নীরব যুদ্ধের বলি হচ্ছে সাধারণ জেলে। কেউ ফিরছেন নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে, কেউ আর ফিরছেন না। প্রশাসন বলছে, সীমান্তের বাইরে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের শতাধিক পরিবার এখন এক অনিশ্চিত জীবনের বন্দি।

 

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিনের কার্যালয়ের তথ্যমতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ১১৬ জেলেকে আরাকান আর্মি অপহরণ করেছে। অন্যদিকে বিজিবির তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ২৩৫ জন জেলেকে আটক করেছে গোষ্ঠীটি; এর মধ্যে ১২৪ জন ফেরত এলেও ১১১ জন এখনো নিখোঁজ—তাদের ৬২ জন রোহিঙ্গা।

 

শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন ও টেকনাফের শত শত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু আরাকানে জান্তা সরকারের পতনের পর থেকেই আরাকান আর্মির উৎপাত বাড়ছে। বর্তমানে আরাকানে কোনো কার্যকর সরকার না থাকায়, বাংলাদেশ প্রশাসন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে আটক জেলেদের ভাগ্য নির্ধারণ করছে আরাকান আর্মির ইচ্ছা।

 

আরাকান আর্মির বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা শাহপরীর দ্বীপের কয়েকজন জেলে জানান, তাদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। দিনে দুবার মারধর করা হয়, খাবারের পরিবর্তে সিদ্ধ কলাগাছ খেতে দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলেন, “আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখা হতো, জিজ্ঞেস করা হতো বিজিবির অবস্থান কোথায়।” এক জেলে বলেন, “আমরা নদীর বাংলাদেশ অংশেই ছিলাম, কিন্তু তারা সীমান্ত থেকে এসে ধরে নিয়ে যায়। আমাদের মাছ, জাল, সব ছিনিয়ে নেয়।”

 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (ICG)–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি কারণে বাংলাদেশি জেলেদের আটক করছে আরাকান আর্মি। প্রথমত, জান্তা সরকারের বিমান হামলার ভয়ে আরাকান আর্মি নদীপথে টহল জোরদার করেছে; ফলে যেকোনো নৌকা দেখলেই তারা ধরে ফেলে। দ্বিতীয়ত, জান্তা সরকারের অবরোধে রাখাইনে খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকট, তাই তারা বাংলাদেশি জেলেদের নৌকা, মাছ, খাবার ও সরঞ্জাম ছিনিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত, জেলেদের আটক করে বাংলাদেশের সঙ্গে একধরনের অঘোষিত যোগাযোগ স্থাপন করে নিজেদের বৈধ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চাচ্ছে তারা।

সেন্টমার্টিন থেকে ৩১ আগস্ট তিনটি নৌকার ১৮ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। তাদের মধ্যে রয়েছেন আবু তারেক, জিয়াউল হক, রহমত উল্লাহ, রফিক, আব্দুল মোতালেব, আবু বকর সিদ্দিক, তাহের, সাব্বির আহমেদ, মনিউল্লাহ, ছৈয়দুল্লাহ, আব্দুর রহিম, হাফেজ আহমদ , সালাহউদ্দিন, আফসার উদ্দিন ও মো. আইয়ুব। এ ছাড়া একই পরিবারের চারজন—জাহাঙ্গীর আলম, আলমগীর, আলহাজ উদ্দিন ও তাদের ভগ্নিপতি সাব্বির আহমেদ—নিখোঁজ।

জাহাঙ্গীরের মা মদিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “চারজনকে হারিয়ে দিন কাটে খেয়ে-না খেয়ে। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে। আমার একটাই দাবি—সন্তানরা যেন কোনোভাবে ফিরে আসে।” আরেক জেলে আইয়ুবের ছেলে সায়েম বলেন, “বাবা না ফেরায় পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।”

শাহপরীর দ্বীপের বোট মালিক মো. ওসমান জানান, তার ট্রলারসহ ১১ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। “আমার চোখের সামনে বাংলাদেশের সীমানা থেকেই ধরে নিয়ে যায়,” বললেন তিনি। তিনি আরও জানান, ওপারের কয়েকজন রোহিঙ্গার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন তাদের অবস্থার কথা। স্থানীয় সৈয়দ আলম বলেন, “৮ বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করে এই বোট বানিয়েছি। মাত্র দুই মাস হলো জলে নামিয়েছি—এখন সব শেষ। শুধু আমার নয়, ৫টি পরিবারের জীবিকা এখন বন্ধ।”

বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ জানান, “টেকনাফের কেকে খালের ঘাটের ৯টি বোটসহ ৬৫ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। তাদের মধ্যে ৬১ জন রোহিঙ্গা। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, দ্রুত তাদের ফিরিয়ে আনা হোক।” তিনি আরও বলেন, “অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। জেলেরা এখন নদীতে যেতে ভয় পান। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে হবে।”

টেকনাফের ইউএনও শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, “গত দুই মাসে ১১৬ জেলে আটক হয়েছে। আমরা জেলেদের সচেতন করছি, কিন্তু অন্য দেশের জলসীমায় গিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।” তিনি আরও জানান, “সব জেলে তো রিপোর্ট করে না। আমাদের তালিকায় ১৩টি বোটের ৯১ জন জেলের নাম পাওয়া গেছে।”

স্থানীয় বোট মালিকদের মতে, নাফ নদে সীমারেখা স্পষ্ট নয়। ফলে জেলেরা ভুলবশত মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়েন। আবার অনেকে ইচ্ছাকৃত যান, কারণ সেখানেই বেশি মাছ মেলে। এক জেলে বলেন, “একটা বোট নিয়ে সমুদ্রে গেলে তেল ও খাবারসহ খরচ হয় ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা। মাছ না পেলে লোকসানের অর্ধেক আমাদের। তখন বাধ্য হয়ে সীমান্ত পেরোতে হয়।”

নাফ নদ আজ শুধু একটি সীমান্ত নদ নয়—এটি এখন দুই দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মানবিক প্রতীক। এখানে জড়িয়ে আছে জেলেদের জীবন, মায়েদের অশ্রু, শিশুদের ক্ষুধা আর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা। আরাকান আর্মির বন্দুকের নলের ছায়ায় নাফ নদে আজ কেউ মাছ ধরে না—সবাই শুধু প্রার্থনা করে, যেন আর কোনো জেলে না হারায় এই নদীর স্রোতে।

পোষ্টটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর
© 2025 Shimanto Shohor
Site Customized By NewsTech.Com