ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে একদিকে যেমন দেশব্যাপী চলমান তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের নজিরবিহীন ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা খাতের দীর্ঘ দেড় দশকের দুর্নীতির মূলোৎপাটনে শ্বেতপত্র প্রকাশের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে শহর-গ্রামের বৈষম্য দূরীকরণে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিংয়ের ঘোষণা এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়, চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংসদ অধিবেশনের আজকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়কে জাতীয় সংকট হিসেবে অভিহিত করে তা মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নজিরবিহীন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। সেইসঙ্গে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শহর ও গ্রামের বিদ্যুৎ বণ্টনে সমতা আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে; যার অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ কৃষকের সেচ কাজে ব্যবহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষা খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিগত ১৬ বছরের দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের অঙ্গীকার করেছেন এবং ইতোমধ্যে জাল সনদধারী ২০২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সংসদীয় কার্যক্রমে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প ‘কেরু অ্যান্ড কোম্পানি’র আধুনিকায়ন এবং উত্তরবঙ্গের সরাসরি রেল সংযোগের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদীয় শিষ্টাচার রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সদস্যদের আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান। সামগ্রিকভাবে এই অধিবেশনটি রাজনৈতিক সহাবস্থান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের নতুন রূপরেখা
যশোর-১ আসনের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য এম আজিজুর রহমান বলেন, সরকার ও বিরোধী দলকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে, যা পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মাধ্যমে সম্ভব।
এছাড়া বিএনপির সংসদ সদস্যরা হাফিজ ইব্রাহিম (ভোলা-২), জয়নুল আবেদিন (বরিশাল-৩), আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ (কক্সবাজার-২), রেজাউল করিম বদশা (বগুড়া-৬), শাহজাহান চৌধুরী (কক্সবাজার-৪), বিরোধী দলের সংসদ সদস্য এম মুক্তার আলী (যশোর-৬), রুহুল আমিন (চুয়াডাঙ্গা-২), আবদুল ওয়ারেস (গাইবান্ধা-৫), মির আহমদ বিন কাসেম (ঢাকা-১৪) আলোচনায় অংশ নেন।
সংসদীয় শিষ্টাচার ও স্পিকারের কঠোর অবস্থান
অধিবেশনের এক পর্যায়ে সংসদীয় রীতিনীতি ও শিষ্টাচার বজায় রাখার বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কঠোর বার্তা দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, অনেক সংসদ সদস্য অধিবেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় স্পিকারের চেয়ারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করছেন না। সংসদ চলাকালীন সদস্যদের যাতায়াত, উচ্চস্বরে কথা বলা এবং এমনকি সংসদ কক্ষের ভেতরে পানাহার করার মতো নজিরবিহীন ঘটনায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্পিকার বলেন, সংসদের একটি ঐতিহ্য আছে। আপনারা যারা নতুন এসেছেন, দয়া করে কার্যপ্রণালী বিধি বা রুলস অব প্রসিডিউর ভালো করে পড়ুন। সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো আচরণ কাম্য নয়। তিনি সংসদ চলাকালীন মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
সামগ্রিকভাবে, ২০তম দিনের এই অধিবেশন ছিল সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক অংশগ্রহণের এক চমৎকার উদাহরণ। জনদুর্ভোগ লাঘব, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়নের মাধ্যমে এই সংসদ জনগণের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার নতুন বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও শিক্ষা খাতের সংকট সমাধানে সরকারের গৃহীত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট