বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় কথিত মাদক কারবারি নুরুল আমিনকে ঘিরে একের পর এক ভয়াবহ অভিযোগে সীমান্তবর্তী পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ সে নিজেকে কখনো ডিবি পুলিশের ঘনিষ্ঠ আবার কখনো বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ইয়াবা সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি এই পরিচয়ের আড়ালে সীমান্ত এলাকায় একটি প্রভাবশালী মাদক চক্র গড়ে তোলা হয়েছে যার মাধ্যমে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা ইয়াবার চালান সংগ্রহ করে তা কুতুপালং ঘুমধুম হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকা সোনাইছড়ি এবং কক্সবাজার শহরসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে এই পুরো নেটওয়ার্কে একাধিক স্তরের লোকজন জড়িত এবং পরিবহন ও কুরিয়ার চক্র ব্যবহার করে মাদক দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগে স্থানীয়দের দাবি সোর্স পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আড়ালে একটি সুবিধাজনক বাণিজ্যিক চক্র তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সীমান্ত থেকে কম দামে ইয়াবা সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন হাত ঘুরিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয় যার ফলে বিপুল অর্থনৈতিক লাভের একটি অবৈধ প্রবাহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায় এই প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে এলাকায় অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ এই চক্রটি কৌশলে তরুণ সমাজকে টার্গেট করছে। সীমান্তঘেঁষা এলাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং জনবহুল স্থানে তাদের তৎপরতা বাড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে করে কিশোর তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং সামাজিক অপরাধও বাড়ছে বলে স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায় নুরুল আমিন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিছামারা এলাকার মো ইউসুফের ছেলে। কয়েক মাস আগেও তার আর্থিক অবস্থা দুর্বল ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। কিন্তু হঠাৎ করেই বিপুল সম্পদের মালিক হওয়াকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক সন্দেহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় তার একটি পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে এবং নাইক্ষ্যংছড়ি বাজারে আহিল স্টোর নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে এসব সম্পদের পেছনে অবৈধ অর্থের প্রভাব থাকতে পারে। স্থানীয়রা বলছেন স্বল্প সময়ে এই ধরনের সম্পদের উত্থান স্বাভাবিক নয় এবং এর পেছনে একটি বড় ধরনের অবৈধ নেটওয়ার্ক কাজ করতে পারে।
এদিকে নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য দেননি বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নুরুল আমিনের পক্ষ থেকে একটি পাল্টা ও বিস্ফোরক বক্তব্য পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেন এটি তাকে ঘিরে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী গত ৪ তারিখ তিনি ইয়ামাহা শোরুমে বাইক সার্ভিসিং করতে গেলে তার এক বন্ধু এবং কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি মিলে তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তাকে আটকে রেখে তার মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে দুটি পৃথক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং ২ লাখ ৬ হাজার ৪০০ টাকা উত্তোলন করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন এরপর তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক তার কাছ থেকে দুটি খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। নুরুল আমিনের ভাষ্য এই ঘটনার পর তিনি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট নিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে।
তবে ইয়াবা ব্যবসা সীমান্ত সিন্ডিকেট এবং সোর্স পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি বলে জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সন্দেহজনক। একদিকে রয়েছে মাদক সিন্ডিকেটের ভয়াবহ অভিযোগ অন্যদিকে রয়েছে অপহরণ ও অর্থ লুটের পাল্টা দাবি। ফলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চরম ধোঁয়াশা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি বিষয়টির নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সীমান্তজুড়ে মাদক বিস্তার রোধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাল্টা অভিযোগগুলোরও সঠিক তদন্ত হওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
সবমিলিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এখন দুই ধরনের বিস্ফোরক অভিযোগের মুখোমুখি একদিকে কথিত শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটের বিস্তার অন্যদিকে অপহরণ ও অর্থ লুটের পাল্টা দাবি। পরিস্থিতি যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে তাতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
সূত্র: কক্সবাজার জার্নাল